আলঙ্কারিক পলাশ
অমিত বিশ্বাসখয়েরী রঙের খাড়াই দেওয়ালে খড়িগোলা এবং বেজীর লোমের নিষিদ্ধ তুলি দিয়ে চমৎকার একটি গোল আঁকছিলাম, এমন সময় পেছন থেকে শুনতে পেলাম 'আপনি তো খুব ভালো কল্কা করতে পারেন।' তুলি ও খড়িগোলা পাত্রটি হাতেই ধরা থাকল, বিস্মিত হয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে পাড়ায় সদ্য আগত প্রতিবেশিনীটিকে দেখলুম। প্রত্যুত্তরে প্রশয়ের হাসি হেসে আলোচনায় পূর্ণচ্ছেদ দিলুম। পাড়ার প্যান্ডেলে আমার আঁকা নক্সাটি যেকোনো তৃতীয় শ্রেণীর নক্সা আঁকিয়েকে লজ্জা দেবে সেটা ১০০% নিশ্চিত।
সাধারণ মানুষ বিশেষত নিন্ম-মধ্যবিত্ত সমাজের বাসিন্দাররা আলপনা বা নক্সাকে বড়মাপের শিল্পকর্ম বলে মনে করেন। আবার ছবি আঁকিয়েরা একে দুয়োরাণীর মতো দেখেন। ব্যক্তিগত ভাবে আমার মনে হয় ছবিও একধরণের নক্সা বিশেষ, ছবিতে কেবলমাত্র একই ধরণের নক্সার পুনঃপুনঃ উৎপাদন করা হয় না - এটাই পার্থক্য। আরো একটি ধারণা সমাজে চালু আছে যে নক্সা বা আলপনা মেয়েলী শিল্পকর্ম। ধারণাটাই এতো বোকা বোকা যে এই নিয়ে বাদানুবাদ বৃথা।
প্রাচীনকাল থেকেই কল্কা বা নক্সা অজানতেই আমাদের জীবনের অঙ্গ হিসাবে রয়েছে, জীবনযাত্রার সঙ্গে মিশে যাওয়াটাই এর সফলতা। কল্কা কোনো ভিনগ্রহীদের দান নয়, জীবনের নির্যাস থেকেই এর জন্ম। ফুল-লতা-পাতা, মাছ-হাঁস জাতীয় প্রাণী, দৈনন্দিন ব্যবহৃত বস্তু শঙ্খ, প্রদীপ প্রভৃতির সঙ্গে সরল অঙ্কনশৈলী অথবা বস্তুর অন্তর্গত জ্যামিতিক বিমূর্ততা থেকেই এর সৃষ্টি। স্বভাবতই মনের মধ্যে আশা তৈরি হয় পলাশ-অনুষঙ্গ নিয়ে নক্সা বা আলপনা সৃষ্টি সম্ভব।
"চিত্রকলায় পলাশ অনুষঙ্গ" শিরোনামে অধম এই প্রাবন্ধিক দেখিয়েছিলেন কিভাবে পলাশ সমসাময়িক জয়নুল আবেদিন, নন্দলাল বসু , রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়, রামকিঙ্কর থেকে সাম্প্রতিকতম যোগেন চৌধুরী, রামচন্দ্রম হয়ে কনিষ্ঠ অনুপ এম.জি. পর্যন্ত শিল্পীদের শিল্পকর্মে জায়গা করে নিয়েছে। সেই প্রবন্ধে আলঙ্কারিক পলাশ অনালোচিত ছিল, কিছুটা আলোচনা একমুখী করার জন্য আর কিছুটা তথ্য সম্পর্কে প্রাবন্ধিকের অজ্ঞতার কারণে। নন্দলাল বসুর হাতে গড়া শান্তিনিকেতনের শিল্পভান্ডার সূচনাপর্ব থেকেই পলাশ সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছিল। তার স্রোত এখন কোনদিকে বয়ে চলেছে সেটাই আমরা দেখব।
রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে লৌকিক স্রোতকে অসম্ভব গুরুত্ব দিয়ে দেখতেন সেকথা না বললেও চলে। আলপনা একটি লৌকিক উপাদান, যার মধ্যে লুকিয়ে থাকে সাধারণ মানুষের চাওয়া পাওয়া কামনার গল্প। প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায় বান্ধবহীন আশ্রমিকরা দোল, বর্ষাবরণ, বৃক্ষরোপন বা অতিথিবরণ প্রভৃতি অনুষ্ঠানে নিজেদের একত্রিত করতেন। আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুবান্ধবদের আগমন ঘটতো এই সময়। অনুষ্ঠান উৎসবে পরিণত হতো। এই উৎসবের অঙ্গসজ্জায় প্রয়োজন ঘটতো আলপনার। প্রসঙ্গত জানাই শান্তিনিকেতনে সর্বপ্রথম সুকুমারী দেবী ঘরোয়া আলপনাকে নিয়ে আসেন। নন্দলাল বসুর উৎসাহে এটি পরিমার্জিত হয়। আলোচ্য বড়মাপের আলপনা এই সকল আলপনাগুলি প্রচলিত নক্সার চর্বিতচর্বণ না হয়ে রসদ সংগ্রহ করল আশে পাশে ছড়িয়ে থাকা প্রাকৃতিক অথবা দৈনন্দিন উপাদানগুলি থেকে। ধীরে ধীরে উধাও হয়ে গেল ধর্মীয় অনুসঙ্গগুলি অর্থাৎ কড়ি, মাঙ্গলিক চিহ্ন, আসরে এলো স্থানীয় গাছ ও পশুপাখি, সাঁওতাল দেওয়ালচিত্রের নক্সা, ঋতু-সসম্পর্কিত উপাদান এবং পলাশ।পরবর্তীকালে আশ্রমিকরা আলপনাকে আর ভূমির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলেন না, নাটক ইত্যাদির মঞ্চ-নির্মাণে সেটি খাঁড়াই দেওয়ালেও সজ্জিত হতে লাগলো।
নন্দলাল বসুর সময় থেকেই আলপনাচর্চার ক্লাস শুরু হয় এবং পরবর্তীকালে নন্দলাল কন্যা যমুনা ও গৌরীদেবীর তত্বাবধানে প্রায় সকল আশ্রমিক শিল্পীদের ক্লাসে যোগদান আব্যশিক। যতদূর জানা যায় আশ্রমিকরা প্রথমে প্রকৃতিকে পর্যবেক্ষণ করতেন। তারপর সেই পর্যবেক্ষণ মাথায় গেঁথে ঘরে ফিরে এসে স্মৃতি থেকে আবর্জনা বাদ দিয়ে শুধুমাত্র নির্যাসটুকু নিয়ে সেটি খাতাতে লিপিবদ্ধ করতেন। এর পর সেই খাতা থেকে ধীরে ধীরে কিছু উপাদান সরাসরি ছবি/ভাস্কর্যে ব্যবহত হত আর কিছু উপাদান অলঙ্করণে রূপান্তর ঘটতো। এই বিশেষ ধারাটি শিল্পী ননীগোপাল ঘোষের সময় পর্যন্ত বর্তমান ছিল। এরপর যোগ্য উত্তরসূরির অভাবে কিছুকাল এই আলপনা চর্চার থেকে শিল্পীরা সাময়িক বিরতি নেন বা সঠিক ভাবে বলা যেতে পারে যে তারা নতুন আবিষ্কারের মজা হারিয়ে ফেলেন।
পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো শিল্পধারার পূর্ণমৃত্যু ঘটে না ... ফল্গুধারার মতো বয়ে চলে। আলপনার ইতিহাসেও তাই ঘটলো। শান্তিনিকেতনের ব্যবহারিক শিল্পে এবং গতানুগতিক আলপনার মধ্যে ধারাটি রয়ে গেল। এই শতাব্দীতে আলপনা নক্সার যে চোরা স্রোত বইছিল শান্তিনিকেতনে, তাকে পুনরুজ্জীবিত এবং মার্জিত করে তোলেন শিল্পী সুধীরঞ্জন মুখোপাধ্যায়। তিনি এই বিশাল প্রতিষ্ঠানের শিক্ষাসত্রের অঙ্কন-শিক্ষকও বটে। আজও সুধীরঞ্জন শান্তিনিকেতনের পালিত উৎসবগুলিতে কখনো একা কখনো ছাত্রছাত্রী অথবা অনুজ শিল্পীদের সহায়তায় বড় বড় আলপনা সৃষ্টি করে চলেছেন। এই কর্মশালায় অনেকেই শিল্পীর থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছেন আবার কেউ কেউ প্রায় সমসাময়িকী চর্চা চালিয়ে যাচ্ছেন। যেহেতু তাদের কাজ এখনো সঠিকভাবে জনসমক্ষে আসে নি তাই আমরা এই আলোচনা সুধীরঞ্জনে সীমাবদ্ধ রাখব। পরবর্তী প্রজন্মের কাজ নিশ্চয় পরবর্তীকালে আলোচিত হবে এবং শিল্পভান্ডারকে সমৃদ্ধ করবে।
সুধীরঞ্জন বড়মাপের আলপনায় বা মঞ্চসজ্জায় যে যে মোটিফগুলি ব্যবহার করেন তার মধ্যে পলাশ অন্যতম। আলোচনাকে একমুখী করতে আমরা তাঁর পলাশ সম্পর্কিত আলপনাগুলি কিভাবে গড়ে ওঠে সেদিকেই মনসংযোগ করিব। প্রসঙ্গত জানাই সুধীরঞ্জন মুখোপাধ্যায়ের আলপনা জগত একটি পৃথক প্রবন্ধের দাবীদার।
স্টাডিপর্বে সুধীরঞ্জন সরাসরি পলাশগাছের প্রতিটি অংশকে পৃথক ভাবে পেনসিল দিয়ে ড্রইং করেন। প্রথমে পাতার শিরা, পাপড়ি ও বৃন্তের প্রতিটি মোচড় বা মুভমেন্ট এবং গাছের গুঁড়ির চলন নিঁখুতভাবে অনুধাবন করেন। এরপর ঐ মোচড় বা মুভমেন্টগুলি রেখাচিত্রে রূপান্তরিত হবার পড়ে অসংখ্য রেখা দ্বারা ধীরে ধীরে আলোছায়া গড়ে তোলেন রেখাচিত্রের উপরেই।। এখানে লক্ষনীয় পলাশফুলের, বৃন্তের অথবা পাতার চলনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই ছায়া অংশে মুভমেন্ট ধরা হয়। পেনসিল স্টাডির এখানেই শেষ।
এই পরের ধাপ হলো পাতা, কুঁড়ি এবং ফুলসহ পলাশ গাছটিকে দ্বিমাত্রিক অলংকারে রূপান্তর ঘটানো। বড়মাপের এই আলপনার অন্যতম প্রধান গুণ হলো তার চলন বা মুভমেন্ট। রেখা একস্থান থেকে চলা শুরু করে চিত্রপটে ছড়িয়ে পড়ে ... অনেকটাই ছবির কম্পোজিশানের মতন। প্রাচীন আলপনার ছিল কলমীলতার চলন অর্থাৎ একটি রেখা ক্রমাগত চলেছে লতারূপে আর মাঝে মধ্যে কলমীপাতা এপাশে ওপাশে পুনঃ পুনঃ এঁকে গতির ভারসাম্য বজায় রাখা হচ্ছে। এই রচনা/কম্পোজিশানটি সুধীরঞ্জন বদল ঘটালেন। মূলরেখা গতিশীল রাখলেন। কিন্তু দুইপাশের ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য পলাশফুল এবং পাতার দ্বিমাত্রিক নক্সার আকারের পরিবর্তন ঘটালেন। কখনো শুরু করলেন ছোট একটি পলাশ ফুল দিয়ে, তারপর পরবর্তী ফুলগুলির আকার ধীরে ধীরে বৃদ্ধি করে ; আবার কখনো ঠিক তার বিপরীত অর্থাৎ বড় আকারের ফুল/পাতা দিয়ে শুরু করে ক্ষুদ্রতে মিলিয়ে দিলেন। আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত সুধীরঞ্জন এরপর যে বদলটি করলেন সেটি মধ্যযুগীয় ভারতীয় মিনিয়েচার শিল্পকর্মের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। শিল্পী জানেন রিপিটেশনে দর্শকের একঘেয়েমি আসে ক্লান্তি আসে। তাই তিনি একঘেয়েমি নক্সার মাঝে ব্রেক আনলেন, কখনো পাতার শিরার প্যাটানের মধ্যে একটি নক্সার গতি বদল করলেন, আবার কখনো বা ভারাক্রান্ত নক্সাগুলির বিপরীত দিকে একটি প্রতিচ্ছায়া (মিরর ইমেজ) নক্সা আঁকলেন। ঠিক যেভাবে একদল একমুখী সৈন্য বা পশু অথবা মানুষের মধ্যে বিপরীতমুখী একটি মানুষ বা পশু এঁকে দিতেন মিনিয়েচার শিল্পীরা। চমৎকার ভারসাম্য ফুটে উঠত তাতে এবং একঘেয়েমির সমাপ্তী ঘটতো।
এবার রাঙানোর পালা। লৌকিক শিল্পী কালিঘাটের পটুয়ারা ছবিতে রেখার বাহিরের দিকে কড়া আর ভিতরের দিকে শেডিং-এর মতো মোলায়েম পোঁচ দিতেন তুলির একটানে। যামিনী রায় প্রমুখ আধুনিক শিল্পীরা সেখানে ব্যবহার করলেন জোড়া পার্শ্বরেখা। অর্থাৎ ছবির পার্শ্বরেখাকে ভাঙলেন একই গাঢ় রঙের দুটি ভিন্ন শেডে। ফলে ছবি ঘিরে গড়ে উঠল এক মার্জিত অনুভূতি। সুধীরঞ্জন এই পদ্ধতিকে আরো একধাপ এগিয়ে নিয়ে গেলেন। একটি গাছ যেভাবে মাটি থেকে উপরের দিকে উঠে ডালপালা নিয়ে ছড়িয়ে পরে, সুধীরঞ্জনের পলাশ বিষয়ক আলপনার স্থাপত্য সেই রূপ গড়ন। পাতার সীমারেখার দুইপাশে ভারসাম্য থেকে একটুকরো নীল আকাশের স্বাভাবিক নক্সা টানা হয়েছে। এরপর গাঢ় নীলের সঙ্গে সবুজ পাতার রঙ মিশিয়ে ঘন ছায়া আভাসে আনা হয়েছে অথবা বলা যেতে পারে ওখানে রয়েছে দূরের গাছের বিস্তার। সামান্য দু-চারটি লাল রেখার পাতায় পরিমিত সবুজের ছোঁয়া লাগানো। তিনি পলাশফুলের জমিকে রাখলেন সাদা, তার উপর চাপালেন ফুলের চলন অনুসারে বাসন্তী হলুদের রেখা। সর্বশেষে দিলেন তপ্ত লালের পার্শ্বরেখা। এই লালরঙেই আমরা বহুদূর থেকে টের পাই পলাশের উপস্থিতি ।
শিল্পসৃষ্টি সার্থক হয় যখন সে ছড়িয়ে পড়ে সাধারণের মধ্যে। আলপনা সেই রকম এক মাধ্যম যেখানে প্রকৃতির উপাদানগুলির আকার নির্যাসরূপে মিশে যায়।জঙ্গলে পলাশগাছ অন্যগাছের সঙ্গে মিশে থাকে... বসন্তের আগমনে সে স্বরূপে প্রকাশ ঘটায়। তখন এই পলাশ-অনুষঙ্গ আলপনা অথবা নক্সা রূপে ছড়িয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের মাঝে ... সার্থক হয় তার সৃষ্টি।





