শতবর্ষের পূর্বে স্মরণে শিল্পী পরিতোষ সেন

শতবর্ষের পূর্বে স্মরণে শিল্পী পরিতোষ সেন

"সেখানকার গ্রামে (মালাবার উপকুলের কোচিন অঞ্চল) এক মধ্যবয়েসী স্বাস্থ্যবতী রমনীকে তার পূর্ণবর্ধিত লাউ-এর মতো দুটি স্তনের একটিকে বালিশের মতো ব্যবহার করে গভীর নিদ্রায় তলিয়ে যেতে দেখে কিঞ্চিৎ বিস্ময় মিশ্রিত আমোদ উপভোগ করার কথা এখনো মনে পড়ে।" ... যে কলম থেকে এই কথাগুলি লেখা হয়ে ছিল তার মালিক সম্পর্কে দর্শকের ধারণা ঠিক কীরকম ... নিজের ভাইঝির স্নান-পরবর্তী কার্যকলাপের পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্নণাতেও কলম এগিয়ে চলে সমান তালে। দর্শকের মনে আঘাত করতে পারে লেখকের লিবিডো-আক্রান্ত মতিচ্ছন্ন। কিন্তু পরবর্তী পরিচ্ছদে দেখা যায় তেলেগু বঁধুর দেহ-বর্নণার সঙ্গে অনায়াসে তিনি মিলিয়ে দিয়েছেন অন্যতম ভারতীয় ধ্রুপদী ভাস্কর্য তামিলনাডুর বিখ্যাত নাগেশ্বরম মন্দিয়ের গায়ে খোদিত দন্ডায়মান অর্ধনগ্না রাজকুমারীর মূর্তির সঙ্গে। যার কলমের ধার এত সূক্ষ্ম তো তাঁর তুলির ধার কেমন ? ... বলছি চিত্রশিল্পী পরিতোষ সেনের কথা, বেঁচে থাকলে ২০১৮ তে যার জন্মশতবর্ষ পালন করতেন সানন্দেই। তাঁর কলম এতটাই যুক্তি নির্ভর আর সাবলীল যে সরাসরি বলে বসেন " ... রবীন্দ্রনাথের হাতে সব সময় যে সোনার ফলেছে এমন অন্ধভক্তির উচ্ছ্বাস আমার নেই। অন্তত শতকরা পঁচিশ-ত্রিশ ভাগ তাঁর ছবি মনে রাখার মত কিছু নয়। কিন্তু যেগুলো সত্যি সত্যি 'উতরেছে' তার imaginary concept, রঙ এবং প্রকাশ-ভঙ্গির দিক থেকে এতই মৌলিক যে, তাঁর সর্বোৎকৃষ্ট মানের গান এবং কাব্যের চাইতে কোনও অংশে কম নয়।"  কিষাণগড়ের রাধা, ভ্যান্‌ গঘের চেয়ার অথবা এনায়েত খাঁর মৃত্যুমুখী প্রতিকৃতি নিয়ে রচনা করেছেন অনবদ্য কাহিনী যা শিল্পরসিক থেকে সাধারণ পাঠকের তেষ্টার মেটাতে সক্ষম।

পরিতোষ সেন জন্মগ্রহণ করেন ১৯১৮ সালে বাংলাদেশের ঢাকা জেলায়। মাদ্রাজে সরকারি আর্ট কলেজে শিল্পী দেবীপ্রসাদ রায়চৌধুরীর অধীনে স্নাতক হবার পরে বিদেশে Academie Andre Lhote, the Academie la Grande Chaumiere, the Ecole des Beaux Arts  এবং the Ecole des Louvre in Paris থেকে শিল্পকলায় শিক্ষালাভ করেন। দেশে বিদেশে অজস্র একক ও যৌথ প্রদর্শনী করেন এবং সমসাময়িক ভারতীয় অন্যতম শিল্পীর তকমা অর্জন করেন। বার্ধক্যজনিত কারণে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ২২শে অক্টোবর, ২০০৮।

কলম এবং তুলিতে পরিতোষ সেন সমান ভাবে দক্ষ ছিলেন, যা শিল্পীকুলে এক বিষ্ময়কর ঘটনাও বটে। তিনি ছিলেন 'ক্যালকাটা গ্রুপ' এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। শিল্পকলায় লৌকিক রূপবন্ধ থেকে আধা-বিমূর্ত উভয় রূপনির্মানে তিনি ছিলেন স্বছন্দ। সংগীতজ্ঞ বড়ে গুলাম আলি (১৯৬৮) শিরোনামে ছবিটি তাঁর সংগীতের বিমূর্ত রূপকল্পের অনবদ্য নির্মাণ। পরিতোষ সেনকে বলা হয় অতৃপ্ত রাগী শিল্পী, সামাজিক ভ্রষ্টাচারের টানাপোড়েনের নগ্নরূপ সরাসরি ক্যানভাসে রূপদান করেন। আত্মপ্রতিকৃতি এঁকেছেন অসংখ্য ... অধিকাংশই নিজেকে ব্যঙ্গ করে, কোথাও পানপাত্র হাতে ; কোথাও বা তরুণীর স্পর্শকাতর। এঁকেছেন সহজ সরল বালক বা কিশোরীর চিত্ররূপ, কখনো বা মোচা সহ স্থির চিত্র কিন্তু সর্বত্র এত সাবলীল সরলতা যে মনে হয় তিনি বাংলার লৌকিক পরম্পরা আর পট শিল্পীদের উত্তরসূরী। বিদেশ ভ্রমণ ও শিক্ষা তাকে রূপনির্মাণে আরো শিক্ষিত করেছে, রচনায় তাই এসেছে উত্তর-অভিব্যক্তিবাদের নির্যাস। এঁকেছেন পৌরাণিক কাহিনী থেকে রবীন্দ্রসাহিত্য হয়ে জীবনানন্দ দাশ ... সর্বত্রই তিনি সফল। দর্শকের তাঁর ছবিতে  একাত্মা হয়ে যায় সহজেই, একজন শিল্পীর কাছে এটা সবচেয়ে বড় পাওনা।

সারাজীবন শিল্পের একনিষ্ঠ সাধক ছিলেন পরিতোষ সেন।  ফরাসী সরকারের বৃত্তি নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হস্তাক্ষর থেকে ছাপা অক্ষরের গবেষণায় মত্ত থেকেছেন, শিল্পকর্ম নিয়ে অসংখ্য লেখালেখি করেছেন।  বিশ্ববিখ্যাত ভাস্কর ব্রাঁকুসি এবং চিত্রশিল্পী পিকাসোর সাহচর্য মিলেছিল, পিকাসো তাকে প্রস্তাব করেছিলেন যুগ্ম প্রদর্শনীর জন্য। ততদিনে দেশে ফেরার প্রবল ইচ্ছা চাগাড় দেওয়ায় এই সুযোগ তিনি কাজে লাগান নি, অনুশোচনা ছিলো এ নিয়ে। আশা করাই যায় যে তাহলে ভারতের শিল্পইতিহাসটি লেখা হত অন্যভাবে। সন্মান আর পুরস্কার পেয়েছেন অগুনতি। কিন্তু এই সঙ্গে জুটেছে এক ধরণের অবজ্ঞা। সহজ সরল রচনা কৌশল বিশেষত বাংলার লৌকিক রূপনির্মাণকে উত্তর অভিব্যক্তিবাদের সঙ্গে মিশিয়ে চিত্রপটে ব্যবহার করাকে অনেকেই সুনজরে দেখে নি, এর মধ্যে সহকর্মী শিল্পী থেকে  শিল্প- শিক্ষার্থী হয়ে নাকউঁচু দর্শক সবাই আছে। ক্ষোভ তাই মাঝে মধ্যে তুলি, কলম বা সাক্ষাৎকারে ঝরে পড়েছিল। মৃত্যুর কয়েকবছর আগেও সংগ্রাহকরা তেমন আগ্রহ দেখান নি। এগুলি না পেলেও অগুনতি দর্শক আর পাঠকদের কাছে তিনি ছিলেন শ্রদ্ধেয়। নবীন শিল্পী যারা ধার করা নয়, বাংলার সমৃদ্ধ ভান্ডার থেকে নিজেদের শিল্পকলাকে উন্নত করে বিশ্ব দরবারে প্রতিষ্ঠিত করতে চান তাদের কাছে পরিতোষ সেন অন্যতম দিশারী। জন্মশতবর্ষ পালনের আগে শিল্পী পরিতোষ সেনের অবদানের জন্য শিল্পী ও পাঠককুলের পক্ষ থেকে স্বশ্রদ্ধেয় প্রণাম।

আসুন আজ তাঁর শিল্পকর্মগুলি মধ্যে কিছুক্ষণ ঘুরে বেড়াই

বুদবুদ নিয়ে আধুনিকা বালিকার খেলা, শৈশবের আমোদ, সেযুগেও ছিল ... এযুগেও তার জনপ্রিয়তা একবিন্দু করেনি।

 মেটে ছাই রঙের পশ্চাদপটে বাজারি ক্যালেন্ডার শোভা পাচ্ছে, আরামকেদারায় অর্ধশোয়া অবস্থায় শিল্পী কোলে একটি বই ... অবসর জীবনের বিনোদনে আর পানাহারে ব্যস্ত শিল্পীর তির্যক আত্মপ্রতিকৃতি নির্মাণ।

পৃথুলা মধ্যবয়সী বাঙালী নারীর দ্বি-প্রহরিক বিনোদন চিত্র। সামনে পানের বাটা, দৈহিক সম্পদ আর স্বর্ণালাংকারে সমৃদ্ধ, হাতে যাঁতি। সহজ-সরল রূপনির্মাণ।

লৌকিক রূপকল্পের সঙ্গে উত্তর-অভিব্যক্তিবাদের মিশ্রণের উজ্জ্বল উদাহরণ এই ছবিটি। আপাত নিরীহ সাপুড়িয়া ততধিক নিরীহ এক চিমটে দিয়ে সাপের বিষদাঁত ভাঙছে। অ্যাক্রিলিকে আঁকা ছবিটি এককথায় অনবদ্য। পশ্চাদপটের লাল রঙ  ভীতু/দূর্বল সাপটির যন্ত্রণার সঙ্গে একাত্মায় দৃশ্যমান।

আপাত নিরীহ এক আধুনিকা কিশোরী বাজার থেকে ফিরছে, বাম হাতে সব্জির থলে। ডান মুঠোয় আতংকগ্রস্থ এক মোরগের উপস্থাপনা ছবিটিকে নতুন ভাবে ভাবতে বাধ্য করে। কিশোরীর মুখমন্ডল গাঢ় ছায়াতে আঁকা। লালসার রূপনির্মাণের স্বচেতন প্রয়াস।

মোচা, শসা, পাকা আম, লিচু , মুলো ইত্যাদি বাঙালীর প্রিয় ফল ও সবজি দিয়ে স্থিরচিত্র (still life) নির্মাণ। রচনাশৈলী অনেকটাই বটতলার কাঠখোদাই থেকে অনুপ্রাণিত, বলা যেতে পারে নতুনভাবে নির্মাণ। নাকউঁচু সমালোচক অথবা শিল্প-শিক্ষার্থীদের অপছন্দের বিষয় হলেও এই ছবি বাঙালী আধুনিক রূপকল্পের অন্যতম উদাহরণ বলা যেতে পারে।

মিশ্রমাধ্যমে আঁকা ছবিটি সৃষ্টিকাল ১৯৪৬ সাল। ট্রেনের একটি তৃতীয় শ্রেণীর কামরা, প্রতিচ্ছায়াবাদীদের মতো করে নির্মিত ছবিটি বেশ মজাদার।

কালিঘাট পটের সেই বহুচর্চিত ছবিগুলি মনে আছে, যেগুলিতে সামাজিক ভ্রষ্টাচারের টানাপোড়েনের নগ্নরূপ সরাসরি তুলে ধরা হয়েছিল।  অ্যাক্রিলিকে আঁকা পরিতোষ সেনের এই ছবিটি তার উপযুক্ত উত্তরসূরী। চিত্রকল্পে আমার পাই দুইজন প্রায় নগ্ন সাধু ব্যাঘ্রচর্মের উপর বসে আছে, পাশে ত্রিশূল। দেহে অত্যাধিক মেদের উপস্থিতি তাদের ভোগের অভ্যাসকে চিহ্নিত করে। পিছনে অবস্থিত সাধকের হাতে ধরা কল্কে তাদের নেশাগ্রস্থ জীবনের প্রতীক। সামনের সাধক যার এই জগতের মোহমায়া থেকে মুক্তি ঘটার কথা সে মুঠোফোনে জৈবিক চাহিদায় ব্যস্ত ... উত্তর অভিব্যক্তিবাদী এই ছবি আমাদের অন্তঃসার -শূন্য আধ্যাত্মিক চেতনার কথা ব্যক্ত করে।

মুঠোফোনে ব্যস্ত আধুনিকা, চেয়ারে উপবিষ্ট এই নারীটির দেহসম্পদ শাড়ী ভেদ করে দৃশ্যমান। ছাদ থেকে ঝোলানো আলো সময়কাল বিবৃতি করে। দেওয়ালে উপস্থিত প্রতিকৃতি ধন্দে ফেলে ... এটি প্রেমালাপ না পরকীয়া !!! অ্যাক্রিলিকে আঁকা ২০০৬ সালের এই ছবিটি দ্বিধা-দ্বন্দ নিয়েও বেশ মজাদার বটে।

ইতিহাস বরাবর বিজেতাকে নিয়ে লেখা হয়ে থাকে। তাই পৌরাণিক রামায়ণের ইন্দ্রজিতের অন্যায় হত্যা সমাজকে খুব বেশি আবেগিত করে না। আর তাঁর পিতার (রামায়ণের মূল খলনায়ক) চোখের জল, মনের যন্ত্রণার মূল্য সমাজ পুরোপুরি উপেক্ষা করে। আদি কবির সৃষ্ট এই কাব্যে উপেক্ষিত রাবণ ... কিন্তু আধুনিক কবি বা শিল্পী তাদের নির্মাণে এই ভুলটি করেন না। তাই রাবণের অশ্রু আর রক্তমাখা পরস্পর আবদ্ধ আঙ্গুলগুলি ঋদ্ধ হয় শিল্পীর তুলিতে।

খাদ্য আর খাদকের চিরন্তন সম্পর্ক যদি বদলে যায়, খাদ্য যদি হয়ে ওঠে পরম পোষ্য... ছবিটা তাহলে কেমন হয় ? ছবিতে যে ব্যক্তিটি দৃশ্যমান তাঁর পোষাক এবং টুপি  চিহ্নিত করে নির্দিষ্ট ধর্মের প্রতি তাঁর অনুগত ... আতংক আর বেদনা মিশ্রিত কৌতূহলী মুখ এক ধরণের সংকটের আভাস দেয়। দুইহাতের বাহুবন্ধনে তিনি তাঁর পোষ্যকে এই নিষ্ঠুর সামাজিক অবস্থান থেকে যে কোনো মূল্যেই রক্ষা করবেন এই ঈঙ্গিত দেয় ছবিটি। এইরকম তীর্যক সৃষ্টি কেবলমাত্র পরিতোষ সেনের তুলিতেই সম্ভব।

অমিত বিশ্বাস
কৃষ্ণনগর
১৮/১০/২০১৬

Post a Comment

Previous Post Next Post