চিত্রকলায় পলাশ অনুসঙ্গ
অমিত বিশ্বাস
গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে দুই সাঁওতাল রমণী। একজন গাছে হাত দিয়ে দেহের ভর রেখেছে, অপরজন ধরে আছে তাঁর কাঁধ। দ্বিতীয় রমণীটির বাম কাঁখে আছে চুবড়ি/ঝুড়ি, কিছু টুকিটাকি আনাজ, ফল বা অন্য কিছুও থাকতে পারে তার মধ্যে, যা দৃশ্যত নয়। এঁকেছেন বাংলাদেশের শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন সাহেব। রচনাকাল ১৯৫১। না তিনি তখন শিল্পরসিক বা জনতার কাছ থেকে 'শিল্পাচার্য' শিরোপা পান নি। ঐ বছর তাঁর জীবনের বিশেষ বছর। ঐ বছরে উনি শুরু করবেন ওনার শিল্পকলার জয়যাত্রা, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভ্রাম্যমান প্রদর্শনীর মাধ্যমে, তুলে ধরবেন বাংলার স্পন্দন। ব্যক্তি থেকে শিল্পাচার্য গড়ে ওঠা একদিনের কাজ নয়, দীর্ঘদিনের অধ্যবসায় আর অনুসন্ধান ধীরে ধীরে পূর্ণতার দিকে এগিয়ে চলেছে। তাই আমরা যদি এই ছবিটি বিশ্লেষণ করি তবে দেখবো কি শক্তিশালী বীজ লুকিয়ে আছে। জলরঙে আঁকা ছবিটি হয়তো অতি সাধারণ চিত্রকলার নমুনা হিসাবেই থেকে যেত যদি না ঋষি প্রতিম শিল্পীর স্পর্শ পেত। হালকা ওয়াশের উপর তুলির বলিষ্ঠ টানে রেখানির্ভর ছবি এটি। সমান্তরাল দুটি গাছের একটিতে প্রথম মেয়েটির বামহাত স্পর্শ করে রয়েছে। গাছ দুটির মধ্যে জঙ্গলের সম্ভবনা লুকিয়ে আছে। ব্যালান্সের সূচনা হয়েছে এখান থেকে। এরপর ধীরে ধীরে সেই ব্যালান্স সঞ্চারিত হয়েছে অপর মেয়েটির বামহাতে। সেখান থেকে নিতম্বের কাপড়ের সীমারেখা সমান্তরাল একটি রেখাতে। ছবিটি দেখে মনে হবে মেয়েদুটির নিন্মাঙ্গ ছবির সীমারেখায় স্পর্শ করে নেই, অথচ মজার বিষয় হলো তারা শূন্যে ভাসমানও নয়। ছবির ভ্যলুম ছবিটিকে শক্ত জমি দিয়েছে। আবেদিন সাহেবের এই কম্পোজিশান/রচনা যে কোনো শিল্পীকেই আনন্দ দান করতে। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে এর গ্রহণযোগ্যতা কোথায় ? আছে আর সেটাই এই ছবির সব থেকে গুরুত্বপুর্ণ দিক। সামান্য কয়েকটি লালরঙের ছোট ছোট দলবদ্ধ পোঁচ/ছোপ - মেয়ে দুটির খোঁপাতে, পলাশফুলের অতিবিমূর্ত চিত্রকল্প, এক লহমায় ছবিটিকে অন্যতম সেরা ছবিতে পরিণত করলো। পলাশফুলের ফোটার সিজনে মানবমনে বয়ে যায় বসন্ত। গাছের আড়ালে দাঁড়ানো মেয়ে দুটি সেই বসন্তের আগমনে আহত ... অপেক্ষারত। সামান্য রঙের পোঁচ আর অনুভূতির পলাশফুল, শিল্পশাস্ত্রের ভাষায় লাবণ্য ছবিকে নতুন দর্শনে উত্তরণ ঘটায়।
প্রকৃতপক্ষে পলাশ অতি সংবেদনশীল উদ্ভিদ। জোলো ভূমিতে একেবারেই জন্মায় না, তার চাই রুক্ষ লালমাটি। বাংলায় বিশেষ বিশেষ অঞ্চলের মধ্যে পলাশ সীমাবদ্ধ। এই সীমাবদ্ধতা আঞ্চলিক, নান্দনিক নয়। রুক্ষ মাটিরে এই পলাশফুল ফোটে বসন্তকালে, প্রকৃতির তীব্র আবেদনে। বসন্তে পলাশবন দেখলে মনে হবে আগুন লেগেছে চারিদিকে। এ আগুন কামনার আগুন নয় প্রেমের আগুন, আনন্দের আগুন, উৎসবের আগুন। কালো খোঁপায় এক গোছা পলাশফুল পুরো তনুকে সমৃদ্ধ করে, প্রেম জাগায়। তাই আজ বসন্ত আর পলাশফুল সমার্থক। আধুনিক চিত্রকলায় তাই পলাশ-অনুসঙ্গ একটি শক্তিশালী প্রতীক। ... প্রেমের প্রতীক ... আনন্দের প্রতীক। পলাশের এই চরিত্র শিল্পীদের কাছে ভীষণ প্রীয়। আধুনিক শিল্পকলায় নন্দলাল বসু, যামিনী রায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রামকিঙ্কর, বিনোদবিহারী থেকে শুরু করে নবীন শিল্পীরা পর্যন্ত পলাশফুল,পাতা অথবা সমগ্র গাছকে তাদের চিত্রপটে ব্যবহার করেছেন।
নন্দলাল বসুর অসংখ্য স্কেচ, ড্রইং, অলংকরণ, ম্যুরাল, আলপনায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে পলাশের বিভিন্ন মোটিফ। গাঢ় প্রেক্ষাপটে পলাশফুল খুব সুন্দরভাবে ফোটে, এটা জানতেন রামকিংকর। অসংখ্য রেখাচিত্র, জলরঙে তিনি পলাশ গাছ, ফুলকে ব্যবহার করেছেন। কলাভবন মিউজিয়ামের সংগ্রহে রয়েছে পোষ্টকার্ড মাপের এমন একটি অনামা ছবি। কাজটি জলরঙ এবং কালি দিয়ে আঁকা। বলা বাহুল্য এটি রামকিংকরের প্রিয় মাধ্যম। ঝড়ের কালো মেঘ ঘনিয়ে এসেছে। তার মধ্যে অস্থির রেখা কিলবিল করছে। এমনই গাঢ় প্রেক্ষাপটে বাতাসের অভিমুখে কাত হয়ে রয়েছে পলাশগাছটি, অনুভূতিতে ধরা পড়ে কেবলই পলাশফুল। ডিটেল বর্জিত এই কাজটিতে বসন্তে শিল্পীর মগ্নচেতনার কথাই স্পষ্ট করে।
আমরা জানি ফুলের মধ্যে যৌনতা থাকে। পলাশফুলের বিভিন্ন অংশের সঙ্গে নারী যৌনাঙ্গের খুব সমতা লক্ষ্য করা যায়। ফুলের এই রূপকল্পটি শিল্পীরা বিভিন্নভাবে বিভিন্ন স্বাদে শিল্পকলাতে ব্যবহার করেছেন। তার মধ্যে অন্যতম হলেন আমাদের প্রিয় শিল্পী রবীন্দ্রনাথ। ওনার আঁকা একটি অনামা ছবির কথা বিশেষভাবে এখানে বলবো। কলম বা তুলি দিয়ে প্রায় গাঢ় করে ঢাকা হয়েছে পশ্চাদপট, সামান্য আলো কিন্তু আছে চৌকো খোপে। সামনে দুটি ডাল জুড়ে একটি পলাশফুলের গোছা তৈরি হয়েছে . . . সেই গোছা থেকে আবার একটি ডাল উঠেছে উপরে। সেই ডালে ফুটেছে একজোড়া নীলফুল ! স্বাভাবিক বাস্তবতা ছাড়িয়ে শিল্পী এখানে অবচেতনের টুইলাইটিং জোনে অবস্থান করেছেন। পলাশফুলের সঙ্গে নীলরঙা কাল্পনিক ফুলের অবস্থান সৃষ্ট করেছে এক অবরূদ্ধ যৌনতা। রবীন্দ্রনাথকে আমরা ঋষিতুল্য মনে করি, তাই অনেকেই আমার সঙ্গে একমত হবেন না। তারা মনে করেন বিপত্নীক ঠাকুরের কোনো যৌনচেতনা থাকতে পারে না, যা থাকে তা খাঁটি সন্তরূপ। অথচ দেখুন রবীন্দ্রনাথ কি সুন্দরভাবে তাঁর অবরূদ্ধ যৌনতার অনুভূতিকে শিল্পে পরিণত করেছেন। খুবই মার্জিত এবং পরিচ্ছন্ন কাজ।
পলাশকে সফলভাবে যৌন প্রতীক হিসাবে ব্যবহার করেছেন অপর ভারত বিখ্যাত শিল্পী যোগেন চৌধুরী মহাশয়। ওনার অসংখ্য রেখাচিত্র, ডুডুল, অলংকরণ, ড্রাই প্যাষ্টেল, সরা, সেরিগ্রাফে ছড়িয়ে আছে পলাশফুল, পাতা এবং অনুষঙ্গ। শান্তিনিকেতনের নন্দনমেলায় যোগেনবাবুর সরাতে এই কাজ দেখেন নি বা সংগ্রহ করেন নি এমন শিল্পরসিক বোধহয় খুব কম আছেন। পলাশফুলের এক বিশাল সম্ভার দেখতে পাওয়া যায় ওনার শান্তিনিকেতন পর্বে, যা ক্রমাগত আরো পরিশীলিত হয়ে উঠেছে। মূলত সাদা স্পেসের উপর কালো মোটা রেখায় আঁকা ছবিগুলির মধ্যে যে জোরালো যৌন শক্তি আছে তা প্রবল রাবীন্দ্রিক প্রভাব থাকলেও তাঁর রেখা ভীষণ ওরিজিনাল শরীরী আবেদন সমৃদ্ধ। এককথায় এই কাজগুলিকে বলা যায় প্রেম-যৌনতার আকর যা গড়ে উঠেছে মোটা রেখার বেপরোয়া আর লিরিক্যাল মেজাজের মেলবন্ধনে। ওনার সুযোগ্য ছাত্রী এই সময়ের শিল্পী ইলিনা বণিক তাঁর ছবিতে পলাশকে মিশিয়েছেন মোটা রঙীন রেখা ও রঙে আর সেই সঙ্গে নিজের তীব্র প্যাশানকে।
শিল্পী এ. রামচন্দ্রম দীর্ঘদিন শান্তিনিকেতনের কলাভবনে পড়াশুনা করেছেন, মিশেছেন পলাশনিবিড় পরিবেশের সঙ্গে। পরবর্তীকালে তাঁর ছবিতে ব্যাপকভাবে পলাশ সমৃদ্ধ কাজ দেখা যায়, কখনো সরাসরি কখনো প্রতীকি কখনো বা পৌরাণিক চরিত্রে। 'দি মিথ অফ পলাশ' তাঁর অন্যতম বিখ্যাত সিরিজ যেখানে তিনি নিজেকে চিত্রিত করেছেন চিত্রকর হিসাবে, অন্য চরিত্র হিসাবে অর্ধনারী, বানর, প্রজাপতি, পতঙ্গ আর আছে পলাশ গাছ . . . ব্যাখ্যা নিষ্প্রয়োজন। তেলরঙে বা অ্যাক্রিলিকে আঁকা ছবিগুলি এককথায় অনবদ্য। এখানে তাঁর একটি ২০০৭ সালে আঁকা অনামা ছবিটির কথা বিশেষভাবে বলবো। একটি ভারতীয় নারী বসে আছে পটমধ্যে। পটের বাকি অংশ পলাশ অনুষঙ্গ দিয়ে ভর্তি। পরণের শাড়িটিকে খুব সহজেই নদী, আকাশ অথবা জল হিসাবে ভেবে নিতে পারি। ছবিটিতে নারী ও গাছকে নেগেটিভ ফ্লিমের আদলে আঁকা হয়েছে, ফাইল এক অন্য আমেজও আসে। নারী-প্রকৃতি বা নারী-প্রেম . . . দর্শকের ভেবে নেওয়ার অবাধ স্বাধীনতা দিয়েছেন শিল্পী।
শান্তিনিকেতনে বসবাসকারী শিল্পীদের কাজে পলাশ মিশে গেছে . . . আর আলাদা করার উপায় নেই। উদাহরণ হিসাবে কে.জি. সুব্রক্ষ্মণ্যন (সবার প্রিয় 'মানি দা')এর একটি ছবি ধরা যাক। ছবিটি ন্যাশানাল গ্যালারী অফ মর্ডান আর্ট, দিল্লীর সংগ্রহে আছে, শিরোনাম ফেয়ারী টেলস্ ফ্রম পূর্বাপল্লী সিরিজ (১৯৮৬)। তেলরঙ ও জলরঙে আঁকা ছবিটির বিষয় হলো পূর্বপল্লীর মানুষজন, প্রেমিক-প্রেমিকা, পশু, ছানা-পোনা গাছ-গাছালী আর প্রকৃতিকে নিয়ে জমাট কম্পোজিশান। সেখানে উপস্থিত হয়েছে পলাশফুল, কোনো বাধ্যবাধকতা নয় . . . স্বাভাবিক উপস্থাপনা।
বর্তমান প্রজন্মের অপর এক শিল্পী অনুপ এম.জি. প্রকৃতি ও মানুষের মেলবন্ধন ঘটিয়েছে 'পল্টু অ্যান্ড পলাশ' নামে ছবিটিতে। অ্যাক্রিলিকে আঁকা ছবিটি দক্ষিণ ভারতীয় ম্যুরাল আর আধুনিক রচনার যোগে সৃষ্ট। রামচন্দ্রম যেখানে দেখিয়েছেন নারী এবং পলাশ, সেখানে অনুপ নিয়ে এলেন প্রকৃতিরূপী পলাশ এবং পল্টু নামে অজানা অচেনা গ্রামবাসী মানুষটিকে। এখানে পলাশ অনুসঙ্গ নারী রূপে উপস্থিত। আর পল্টু নামে ব্যক্তিটির পাঞ্জাবীতে পাখি, আদিবাসী মানুষজন, ঘরবাড়ী, নকসা, দৈনন্দিন কাজকর্ম সবই মূর্ত হয়ে উঠেছে। প্রয়োগ কৌশল আর রচনার সারল্য মনে করায় সমকালীন শান্তিনিকেতনের প্রকৃতি সম্পৃক্ত সমগ্র টেক্সট . . .। রামচন্দ্রম, সুব্রক্ষ্মণ্যন আর অনুপ জন্মসূত্রে দক্ষিণ ভারতীয়। তারা দীর্ঘদিন শান্তিনিকেতনে ছিলেন বা আছেন। সময়, অভিজ্ঞতা, ব্যক্তিগত মনন বা মেধা তাদের উদ্বুদ্ধ করেছে পলাশ অনুসঙ্গকে প্রতীকি স্বমহিমায় চিত্রপটে উপস্থিত করতে, চিত্রকলাকে সমৃদ্ধ করতে।
বিশ্বভারতীর বিভিন্ন ভবনের দেওয়ালে রবীন্দ্রনাথ-নন্দলালের উদ্যোগে গড়ে উঠেছিল অসংখ্য ম্যুরাল। বিষয় ভাবনায় পৌরাণিক থেকে সমকালীন লক্ষ্যনীয়। কলাভবনের রথী-মহারথী শিল্পী নন্দলাল, বিনোদবিহারী, রামকিংকর, গৌরি ভঞ্জ, সুব্রক্ষ্মণ্যন, ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ, অর্ধেন্দুকুমার, বিনায়ক মাসোজী, সুকুমারী দেবী, রাণী চন্দ, সোমনাথ হোর প্রমুখ থেকে শুরু করে অধুনা দিলীপ মিত্র, অমিত ডান্ডা, অনুপ এম.জি., গোউরব রায় সবাই এই উৎসবে হাত লাগিয়েছেন। এদের ব্যক্তিগত কাজে যেমন পলাশ অনুসঙ্গ পাওয়া যায় তেমনি ম্যুরাল রচনাতেও সরাসরি অথবা রূপান্তরিত নকসায় পলাশের দেখা মেলে। বিনোদবিহারী কৃত সন্তোষালয়ের দক্ষিণ বারান্দায় ম্যুরালগুলি, নন্দলাল কৃত 'হলকর্ষণ', 'আশ্রম জীবন' প্রভৃতি, সেন্ট্রাল অফিসে অনুপ এম.জি. এর করা 'বৃক্ষরোপণ' ম্যুরালে প্রচুর পলাশের আবির্ভাব ঘটেছে। তালিকা বাড়িয়ে লাভ নেই, কারণ শুধু পলাশ ও শান্তিনিকেতনের ম্যুরাল নিয়ে একটি পৃথক গ্রন্থ লেখা যায়।
পলাশ আমাদের চেতনায় প্রেম আনে, আনন্দ আনে, উৎসব আনে, আনে রুক্ষ প্রকৃতিতে জীবনের ছোঁয়া। কলাভবনের ম্যুরাল ডিপাটমেন্টের সামনে বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে গড়ে উঠেছে একটি স্থায়ী কলাম। শিল্পী গৌরব রায় সেখানে মোজাইকে ফুটিয়ে তুলেছেন আশপাশের পরিবেশের রিফ্লেকশন, প্রকৃতির বাছাই করা কিছু প্রতীকি ইমেজ। খুবই সংবেদনশীল ও গভীর মননে গড়া। শিরোনাম 'ন্যাচারাল কলাম'। বিশ-পঁচিশ বছর পর যখন আশে পাশের পরিবেশ যুগের প্রয়োজন মেনে বদলে যাবে তখনও মূর্ত থাকবে এই কলামের পাখি, লতা-পাতা আর আমাদের পলাশফুল।
অমিত বিশ্বাস
গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে দুই সাঁওতাল রমণী। একজন গাছে হাত দিয়ে দেহের ভর রেখেছে, অপরজন ধরে আছে তাঁর কাঁধ। দ্বিতীয় রমণীটির বাম কাঁখে আছে চুবড়ি/ঝুড়ি, কিছু টুকিটাকি আনাজ, ফল বা অন্য কিছুও থাকতে পারে তার মধ্যে, যা দৃশ্যত নয়। এঁকেছেন বাংলাদেশের শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন সাহেব। রচনাকাল ১৯৫১। না তিনি তখন শিল্পরসিক বা জনতার কাছ থেকে 'শিল্পাচার্য' শিরোপা পান নি। ঐ বছর তাঁর জীবনের বিশেষ বছর। ঐ বছরে উনি শুরু করবেন ওনার শিল্পকলার জয়যাত্রা, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভ্রাম্যমান প্রদর্শনীর মাধ্যমে, তুলে ধরবেন বাংলার স্পন্দন। ব্যক্তি থেকে শিল্পাচার্য গড়ে ওঠা একদিনের কাজ নয়, দীর্ঘদিনের অধ্যবসায় আর অনুসন্ধান ধীরে ধীরে পূর্ণতার দিকে এগিয়ে চলেছে। তাই আমরা যদি এই ছবিটি বিশ্লেষণ করি তবে দেখবো কি শক্তিশালী বীজ লুকিয়ে আছে। জলরঙে আঁকা ছবিটি হয়তো অতি সাধারণ চিত্রকলার নমুনা হিসাবেই থেকে যেত যদি না ঋষি প্রতিম শিল্পীর স্পর্শ পেত। হালকা ওয়াশের উপর তুলির বলিষ্ঠ টানে রেখানির্ভর ছবি এটি। সমান্তরাল দুটি গাছের একটিতে প্রথম মেয়েটির বামহাত স্পর্শ করে রয়েছে। গাছ দুটির মধ্যে জঙ্গলের সম্ভবনা লুকিয়ে আছে। ব্যালান্সের সূচনা হয়েছে এখান থেকে। এরপর ধীরে ধীরে সেই ব্যালান্স সঞ্চারিত হয়েছে অপর মেয়েটির বামহাতে। সেখান থেকে নিতম্বের কাপড়ের সীমারেখা সমান্তরাল একটি রেখাতে। ছবিটি দেখে মনে হবে মেয়েদুটির নিন্মাঙ্গ ছবির সীমারেখায় স্পর্শ করে নেই, অথচ মজার বিষয় হলো তারা শূন্যে ভাসমানও নয়। ছবির ভ্যলুম ছবিটিকে শক্ত জমি দিয়েছে। আবেদিন সাহেবের এই কম্পোজিশান/রচনা যে কোনো শিল্পীকেই আনন্দ দান করতে। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে এর গ্রহণযোগ্যতা কোথায় ? আছে আর সেটাই এই ছবির সব থেকে গুরুত্বপুর্ণ দিক। সামান্য কয়েকটি লালরঙের ছোট ছোট দলবদ্ধ পোঁচ/ছোপ - মেয়ে দুটির খোঁপাতে, পলাশফুলের অতিবিমূর্ত চিত্রকল্প, এক লহমায় ছবিটিকে অন্যতম সেরা ছবিতে পরিণত করলো। পলাশফুলের ফোটার সিজনে মানবমনে বয়ে যায় বসন্ত। গাছের আড়ালে দাঁড়ানো মেয়ে দুটি সেই বসন্তের আগমনে আহত ... অপেক্ষারত। সামান্য রঙের পোঁচ আর অনুভূতির পলাশফুল, শিল্পশাস্ত্রের ভাষায় লাবণ্য ছবিকে নতুন দর্শনে উত্তরণ ঘটায়।
প্রকৃতপক্ষে পলাশ অতি সংবেদনশীল উদ্ভিদ। জোলো ভূমিতে একেবারেই জন্মায় না, তার চাই রুক্ষ লালমাটি। বাংলায় বিশেষ বিশেষ অঞ্চলের মধ্যে পলাশ সীমাবদ্ধ। এই সীমাবদ্ধতা আঞ্চলিক, নান্দনিক নয়। রুক্ষ মাটিরে এই পলাশফুল ফোটে বসন্তকালে, প্রকৃতির তীব্র আবেদনে। বসন্তে পলাশবন দেখলে মনে হবে আগুন লেগেছে চারিদিকে। এ আগুন কামনার আগুন নয় প্রেমের আগুন, আনন্দের আগুন, উৎসবের আগুন। কালো খোঁপায় এক গোছা পলাশফুল পুরো তনুকে সমৃদ্ধ করে, প্রেম জাগায়। তাই আজ বসন্ত আর পলাশফুল সমার্থক। আধুনিক চিত্রকলায় তাই পলাশ-অনুসঙ্গ একটি শক্তিশালী প্রতীক। ... প্রেমের প্রতীক ... আনন্দের প্রতীক। পলাশের এই চরিত্র শিল্পীদের কাছে ভীষণ প্রীয়। আধুনিক শিল্পকলায় নন্দলাল বসু, যামিনী রায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রামকিঙ্কর, বিনোদবিহারী থেকে শুরু করে নবীন শিল্পীরা পর্যন্ত পলাশফুল,পাতা অথবা সমগ্র গাছকে তাদের চিত্রপটে ব্যবহার করেছেন।
নন্দলাল বসুর অসংখ্য স্কেচ, ড্রইং, অলংকরণ, ম্যুরাল, আলপনায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে পলাশের বিভিন্ন মোটিফ। গাঢ় প্রেক্ষাপটে পলাশফুল খুব সুন্দরভাবে ফোটে, এটা জানতেন রামকিংকর। অসংখ্য রেখাচিত্র, জলরঙে তিনি পলাশ গাছ, ফুলকে ব্যবহার করেছেন। কলাভবন মিউজিয়ামের সংগ্রহে রয়েছে পোষ্টকার্ড মাপের এমন একটি অনামা ছবি। কাজটি জলরঙ এবং কালি দিয়ে আঁকা। বলা বাহুল্য এটি রামকিংকরের প্রিয় মাধ্যম। ঝড়ের কালো মেঘ ঘনিয়ে এসেছে। তার মধ্যে অস্থির রেখা কিলবিল করছে। এমনই গাঢ় প্রেক্ষাপটে বাতাসের অভিমুখে কাত হয়ে রয়েছে পলাশগাছটি, অনুভূতিতে ধরা পড়ে কেবলই পলাশফুল। ডিটেল বর্জিত এই কাজটিতে বসন্তে শিল্পীর মগ্নচেতনার কথাই স্পষ্ট করে।
আমরা জানি ফুলের মধ্যে যৌনতা থাকে। পলাশফুলের বিভিন্ন অংশের সঙ্গে নারী যৌনাঙ্গের খুব সমতা লক্ষ্য করা যায়। ফুলের এই রূপকল্পটি শিল্পীরা বিভিন্নভাবে বিভিন্ন স্বাদে শিল্পকলাতে ব্যবহার করেছেন। তার মধ্যে অন্যতম হলেন আমাদের প্রিয় শিল্পী রবীন্দ্রনাথ। ওনার আঁকা একটি অনামা ছবির কথা বিশেষভাবে এখানে বলবো। কলম বা তুলি দিয়ে প্রায় গাঢ় করে ঢাকা হয়েছে পশ্চাদপট, সামান্য আলো কিন্তু আছে চৌকো খোপে। সামনে দুটি ডাল জুড়ে একটি পলাশফুলের গোছা তৈরি হয়েছে . . . সেই গোছা থেকে আবার একটি ডাল উঠেছে উপরে। সেই ডালে ফুটেছে একজোড়া নীলফুল ! স্বাভাবিক বাস্তবতা ছাড়িয়ে শিল্পী এখানে অবচেতনের টুইলাইটিং জোনে অবস্থান করেছেন। পলাশফুলের সঙ্গে নীলরঙা কাল্পনিক ফুলের অবস্থান সৃষ্ট করেছে এক অবরূদ্ধ যৌনতা। রবীন্দ্রনাথকে আমরা ঋষিতুল্য মনে করি, তাই অনেকেই আমার সঙ্গে একমত হবেন না। তারা মনে করেন বিপত্নীক ঠাকুরের কোনো যৌনচেতনা থাকতে পারে না, যা থাকে তা খাঁটি সন্তরূপ। অথচ দেখুন রবীন্দ্রনাথ কি সুন্দরভাবে তাঁর অবরূদ্ধ যৌনতার অনুভূতিকে শিল্পে পরিণত করেছেন। খুবই মার্জিত এবং পরিচ্ছন্ন কাজ।
পলাশকে সফলভাবে যৌন প্রতীক হিসাবে ব্যবহার করেছেন অপর ভারত বিখ্যাত শিল্পী যোগেন চৌধুরী মহাশয়। ওনার অসংখ্য রেখাচিত্র, ডুডুল, অলংকরণ, ড্রাই প্যাষ্টেল, সরা, সেরিগ্রাফে ছড়িয়ে আছে পলাশফুল, পাতা এবং অনুষঙ্গ। শান্তিনিকেতনের নন্দনমেলায় যোগেনবাবুর সরাতে এই কাজ দেখেন নি বা সংগ্রহ করেন নি এমন শিল্পরসিক বোধহয় খুব কম আছেন। পলাশফুলের এক বিশাল সম্ভার দেখতে পাওয়া যায় ওনার শান্তিনিকেতন পর্বে, যা ক্রমাগত আরো পরিশীলিত হয়ে উঠেছে। মূলত সাদা স্পেসের উপর কালো মোটা রেখায় আঁকা ছবিগুলির মধ্যে যে জোরালো যৌন শক্তি আছে তা প্রবল রাবীন্দ্রিক প্রভাব থাকলেও তাঁর রেখা ভীষণ ওরিজিনাল শরীরী আবেদন সমৃদ্ধ। এককথায় এই কাজগুলিকে বলা যায় প্রেম-যৌনতার আকর যা গড়ে উঠেছে মোটা রেখার বেপরোয়া আর লিরিক্যাল মেজাজের মেলবন্ধনে। ওনার সুযোগ্য ছাত্রী এই সময়ের শিল্পী ইলিনা বণিক তাঁর ছবিতে পলাশকে মিশিয়েছেন মোটা রঙীন রেখা ও রঙে আর সেই সঙ্গে নিজের তীব্র প্যাশানকে।
শিল্পী এ. রামচন্দ্রম দীর্ঘদিন শান্তিনিকেতনের কলাভবনে পড়াশুনা করেছেন, মিশেছেন পলাশনিবিড় পরিবেশের সঙ্গে। পরবর্তীকালে তাঁর ছবিতে ব্যাপকভাবে পলাশ সমৃদ্ধ কাজ দেখা যায়, কখনো সরাসরি কখনো প্রতীকি কখনো বা পৌরাণিক চরিত্রে। 'দি মিথ অফ পলাশ' তাঁর অন্যতম বিখ্যাত সিরিজ যেখানে তিনি নিজেকে চিত্রিত করেছেন চিত্রকর হিসাবে, অন্য চরিত্র হিসাবে অর্ধনারী, বানর, প্রজাপতি, পতঙ্গ আর আছে পলাশ গাছ . . . ব্যাখ্যা নিষ্প্রয়োজন। তেলরঙে বা অ্যাক্রিলিকে আঁকা ছবিগুলি এককথায় অনবদ্য। এখানে তাঁর একটি ২০০৭ সালে আঁকা অনামা ছবিটির কথা বিশেষভাবে বলবো। একটি ভারতীয় নারী বসে আছে পটমধ্যে। পটের বাকি অংশ পলাশ অনুষঙ্গ দিয়ে ভর্তি। পরণের শাড়িটিকে খুব সহজেই নদী, আকাশ অথবা জল হিসাবে ভেবে নিতে পারি। ছবিটিতে নারী ও গাছকে নেগেটিভ ফ্লিমের আদলে আঁকা হয়েছে, ফাইল এক অন্য আমেজও আসে। নারী-প্রকৃতি বা নারী-প্রেম . . . দর্শকের ভেবে নেওয়ার অবাধ স্বাধীনতা দিয়েছেন শিল্পী।
শান্তিনিকেতনে বসবাসকারী শিল্পীদের কাজে পলাশ মিশে গেছে . . . আর আলাদা করার উপায় নেই। উদাহরণ হিসাবে কে.জি. সুব্রক্ষ্মণ্যন (সবার প্রিয় 'মানি দা')এর একটি ছবি ধরা যাক। ছবিটি ন্যাশানাল গ্যালারী অফ মর্ডান আর্ট, দিল্লীর সংগ্রহে আছে, শিরোনাম ফেয়ারী টেলস্ ফ্রম পূর্বাপল্লী সিরিজ (১৯৮৬)। তেলরঙ ও জলরঙে আঁকা ছবিটির বিষয় হলো পূর্বপল্লীর মানুষজন, প্রেমিক-প্রেমিকা, পশু, ছানা-পোনা গাছ-গাছালী আর প্রকৃতিকে নিয়ে জমাট কম্পোজিশান। সেখানে উপস্থিত হয়েছে পলাশফুল, কোনো বাধ্যবাধকতা নয় . . . স্বাভাবিক উপস্থাপনা।
বর্তমান প্রজন্মের অপর এক শিল্পী অনুপ এম.জি. প্রকৃতি ও মানুষের মেলবন্ধন ঘটিয়েছে 'পল্টু অ্যান্ড পলাশ' নামে ছবিটিতে। অ্যাক্রিলিকে আঁকা ছবিটি দক্ষিণ ভারতীয় ম্যুরাল আর আধুনিক রচনার যোগে সৃষ্ট। রামচন্দ্রম যেখানে দেখিয়েছেন নারী এবং পলাশ, সেখানে অনুপ নিয়ে এলেন প্রকৃতিরূপী পলাশ এবং পল্টু নামে অজানা অচেনা গ্রামবাসী মানুষটিকে। এখানে পলাশ অনুসঙ্গ নারী রূপে উপস্থিত। আর পল্টু নামে ব্যক্তিটির পাঞ্জাবীতে পাখি, আদিবাসী মানুষজন, ঘরবাড়ী, নকসা, দৈনন্দিন কাজকর্ম সবই মূর্ত হয়ে উঠেছে। প্রয়োগ কৌশল আর রচনার সারল্য মনে করায় সমকালীন শান্তিনিকেতনের প্রকৃতি সম্পৃক্ত সমগ্র টেক্সট . . .। রামচন্দ্রম, সুব্রক্ষ্মণ্যন আর অনুপ জন্মসূত্রে দক্ষিণ ভারতীয়। তারা দীর্ঘদিন শান্তিনিকেতনে ছিলেন বা আছেন। সময়, অভিজ্ঞতা, ব্যক্তিগত মনন বা মেধা তাদের উদ্বুদ্ধ করেছে পলাশ অনুসঙ্গকে প্রতীকি স্বমহিমায় চিত্রপটে উপস্থিত করতে, চিত্রকলাকে সমৃদ্ধ করতে।
বিশ্বভারতীর বিভিন্ন ভবনের দেওয়ালে রবীন্দ্রনাথ-নন্দলালের উদ্যোগে গড়ে উঠেছিল অসংখ্য ম্যুরাল। বিষয় ভাবনায় পৌরাণিক থেকে সমকালীন লক্ষ্যনীয়। কলাভবনের রথী-মহারথী শিল্পী নন্দলাল, বিনোদবিহারী, রামকিংকর, গৌরি ভঞ্জ, সুব্রক্ষ্মণ্যন, ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ, অর্ধেন্দুকুমার, বিনায়ক মাসোজী, সুকুমারী দেবী, রাণী চন্দ, সোমনাথ হোর প্রমুখ থেকে শুরু করে অধুনা দিলীপ মিত্র, অমিত ডান্ডা, অনুপ এম.জি., গোউরব রায় সবাই এই উৎসবে হাত লাগিয়েছেন। এদের ব্যক্তিগত কাজে যেমন পলাশ অনুসঙ্গ পাওয়া যায় তেমনি ম্যুরাল রচনাতেও সরাসরি অথবা রূপান্তরিত নকসায় পলাশের দেখা মেলে। বিনোদবিহারী কৃত সন্তোষালয়ের দক্ষিণ বারান্দায় ম্যুরালগুলি, নন্দলাল কৃত 'হলকর্ষণ', 'আশ্রম জীবন' প্রভৃতি, সেন্ট্রাল অফিসে অনুপ এম.জি. এর করা 'বৃক্ষরোপণ' ম্যুরালে প্রচুর পলাশের আবির্ভাব ঘটেছে। তালিকা বাড়িয়ে লাভ নেই, কারণ শুধু পলাশ ও শান্তিনিকেতনের ম্যুরাল নিয়ে একটি পৃথক গ্রন্থ লেখা যায়।
পলাশ আমাদের চেতনায় প্রেম আনে, আনন্দ আনে, উৎসব আনে, আনে রুক্ষ প্রকৃতিতে জীবনের ছোঁয়া। কলাভবনের ম্যুরাল ডিপাটমেন্টের সামনে বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে গড়ে উঠেছে একটি স্থায়ী কলাম। শিল্পী গৌরব রায় সেখানে মোজাইকে ফুটিয়ে তুলেছেন আশপাশের পরিবেশের রিফ্লেকশন, প্রকৃতির বাছাই করা কিছু প্রতীকি ইমেজ। খুবই সংবেদনশীল ও গভীর মননে গড়া। শিরোনাম 'ন্যাচারাল কলাম'। বিশ-পঁচিশ বছর পর যখন আশে পাশের পরিবেশ যুগের প্রয়োজন মেনে বদলে যাবে তখনও মূর্ত থাকবে এই কলামের পাখি, লতা-পাতা আর আমাদের পলাশফুল।





