মোনালিসা ও ছবি দেখা

মোনালিসা ও ছবি দেখা


'মোনালিসা দেখে আমি বাকরূদ্ধ হয়ে গেছি' এই জাতীয় উক্তি আমরা প্রায় শুনে থাকি সাধারণ বাঙালীর মুখে, যদিও তিনি বা তারা কখনোই লুভ্যর মিউজিয়াম পরিদর্শন করেন নি, দেখেছেন মোনালিসার প্রিন্ট। বাঙালী জেনে গেছে শিল্পকলা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে মোনালিসা অথবা পিকাসো প্রেম জানান দিলে তাঁর সাংস্কৃতিক মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকে। তরুণ বাঙালীকে শিল্পবিষয়ক প্রশ্ন করলে জানা যাবে সাম্প্রতিক কোন ভারতীয় শিল্পীর ছবি কত দামে বিক্রি হয়েছে জাতীয় উত্তর কিন্তু শিল্পের রস সম্পর্কিত উত্তর নৈব নৈব চ।

সার্থক শিল্প সৃষ্টির জন্য যতটা প্রয়োজন শিল্পীর ততটাই রসিক দর্শকের। দর্শক ছাড়া যেকোনো সৃষ্টিই ব্যর্থ। সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে দেখা গেছে বাঙালী সাহিত্য, নাচ, গান, নাটক অথবা সিনেমাতে প্রবল আগ্রহী হলেও গ্যালারী আর শিল্পমেলাগুলিকে স্বযত্নে এড়িয়ে চলেন। স্বনিয়োজিত কিছু মধ্যজীবী আবার শিল্পী ও দর্শকের মধ্যে দূরত্ব কমাতে আগ্রহী। কিন্তু এদের অনেকেই মনে করেন যে দুটি স্পষ্ট বাক্যে যা সঠিক বোঝানো যায় পনেরটি অস্পষ্ট বাক্যে তার ভগ্নাংশকে বোঝানোই নাকি বুদ্ধিজীবীর লক্ষ্মণ। তাই সাধারণ মানুষ মোনালিসার নাম করেই শিল্পকলাকে পাশ কাটিয়ে যান।

জীবের হাসি-কান্না-ব্যাথা-আনন্দ-রাগ অথবা জন্ম-মৃত্যু সম্পর্কিত আবেগের অনুভূতি বিমূর্ত। শিল্পী রঙ ও রেখার সাহায্যে কিছু কিছু সঙ্কেতের মাধ্যমে তাঁর চিত্রপটে এই অনুভূতিগুলি ধরার চেষ্টা করেন। এই সঙ্কেতগুলির মধ্যে কিছুটা রহস্য থাকেই। আর সেগুলি খুঁজে পরপর জুড়ে মূল আবেগকে অনুভব করাই রসিকের কাজ। সমস্যা শুরু হয় তখনই যখন কিছু ব্যক্তি সঙ্কেতের নামে দুর্বোধ্যতা প্রয়োগ করে নিজেকে উচ্চমার্গের শিল্পী হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে চান। একান্ত অনুরোধ এনাদের এড়িয়ে চলুন, তাতে আপনার আর শিল্পকলার উভয়ের মঙ্গল হবে।

স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে তাহলে কোন ধরণের শিল্পকলা/ছবি সাধারণ দর্শক দেখবেন? শিল্পজগতে একটি প্রবাদ আছে - "যে শিল্পী যন্ত্রণা আঁকতে গিয়ে বৃদ্ধার মুখ আঁকেন তিনি অবশ্যই পরিত্যাজ্য"। আসুন দেখি কিভাবে সার্থক শিল্প গড়ে ওঠে। এখানে আমরা দেখব আধুনিক ভারতীয় শিল্পকলার কাণ্ডারি অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের "জার্নি'স এন্ড" নামক ছবিটি। আর দেখব এই সময়ের শিল্পী প্রণব ফৌজদারের আঁকা "লাষ্ট স্টপেজ" শিরোনামের ছবিটি।

শুরুতেই জানিয়ে রাখি এটি কোনো দুই শিল্পীর তুলনামূলক আলোচনা নয় এবং এই দুই শিল্পীর তুলনা-কল্পনা ধৃষ্টতা মাত্র। লেখকের মূল উদ্দেশ্য একই বিষয় নিয়ে দুটি ভিন্ন সময়ের (বাঙালী) শিল্পীর সফল শিল্পকর্মের রসাস্বাদন। টেম্পারা ও ওয়াশে আঁকা Journey's End ছবিটির চিত্রপট জুড়ে একটি মালবাহী উট অবস্থান করছে বিচিত্র ভঙ্গিমায়। পিছনের পা দুটি বোঝার ভার রেখে দাঁড়ানোর ব্যর্থ চেষ্টা করছে, সামনের পা দুটি মুড়ে লম্বা গলা ও মাথাটি কঠিন পাথরে এলিয়ে দিয়েছে উটটি। পশ্চাদপট সূর্যাস্তের রঙে রাঙানো। এরপর দর্শককে বলে দিতে হবে না যে ওই মালবাহী পশুটির অন্তিম সময় আসন্ন। ১৯১৩ সালে অবনীন্দ্রনাথে আঁকা ছোটমাপের (১৫"X১২") এই ছবিটি বর্তমানে NGMA-এ সংরক্ষিত আছে।

অপর আলোচ্য ছবিটি শিল্পী প্রণব ফৌজদার আঁকেন ২০০৫ সালে, শিরোনাম Last Stopage। ফালি ফালি রঙিন কাগজ জুড়ে ২৪.৫"X২১.৭" মাপের ছবিটি গড়ে তোলা হয়েছে চিত্রপটে। সামনে দৃশ্যত পশু অবয়বটি ঘোড়া অপেক্ষা ভারবাহী গাধা বলে বেশি মনে হয়। কঙ্কালসার পশুটিকে ততোধিক কঙ্কালসার মালিক কিছু নির্দেশ বা আদেশ দিচ্ছেন। গৃহপালিত প্রতীকী ঘন্টা পশুটির গলায় বাঁধা। পাশে আভাসে একটি দরজা উপস্থিত, অন্দরমহল লালচে অন্ধকারাচ্ছন্ন। দরজার উপর গোধূলিরঙা কাপড়ের স্পর্শ, খালি কলসি আর আকাশের কালো চাঁদ যেন তার মৃত্যুডাকের ইঙ্গিত জানান দিচ্ছে।

দুটি ছবিই পাশবিক সায়াহ্নকালের অনুভূতি থেকে রচিত। পার্থক্য শুধুমাত্র শিল্পীর রুচি আর অভিজ্ঞতার অবস্থান। উটের সাজসজ্জা, বোঝার বাঁধন, পাথরের মার্জিত গঠনে আমরা পাই অবনীন্দ্রনাথের বৈভব সূলভ উপস্থাপনা। অপরদিকে প্রণবের শিল্পচয়নে গাধা সদৃশ্য পশু, কঙ্কালসার মালিক, দরজার খাঁচাতে পাই নিন্মমধ্যবিত্তের চালচিত্র। এটাই পার্থক্য এটাই বৈশিষ্ট্য। এই অর্থ কোনো শিল্পীই তাঁর নিজের অস্তিত্বকে অস্বীকার করে শিল্পরচনাতে মগ্ন হন নি।

মোনালিসার হাসি রহস্যময় কিনা সেটার গবেষণা পন্ডিতদের উপর ছেড়ে দেওয়া ভালো। কিন্তু মোনালিসাই হোক আর উপরের আলোচ্য শিল্পকর্মদুটির ছবি/প্রিন্ট দেখেই হোক, সাধারণ দর্শকের মনে যে আবেশ সৃষ্টি হয় সেটা জন্য শিল্পী যুগ যুগ অপেক্ষা করেন। শিল্পীর শিল্পকর্মের সার্থকতা এখানেই।

অমিত বিশ্বাস
কৃষ্ণনগর

Post a Comment

Previous Post Next Post