অনুভবে জয়নুল আবেদিন সাহেব
বুধের গায়ে গর্ত, আর সেই গর্তের নামকরণ হয়েছে কোনো বাঙালি চিত্রশিল্পীর নামে, এতোটা সৌভাগ্য এপার বাংলার ক'জন শিল্পীর ভাগ্যে জোটে ? বড়জোর জন্মশতবর্ষে একখানা 'ডাকটিকিট' আর কয়েকটি প্রবন্ধ আর একটি 'রেট্রো'। সেই তুলনায় ইনি বেশ ভাগ্যবান, কাগজের মুদ্রায় (আমাদের দেশে তো সেই লাঠি হাতে বৃদ্ধ ছাড়া কারোর কথাই ভাবা হয় না) ছাপা হয়েছে তাঁর আঁকা ছবি, পাসপোর্ট ও ডাকটিকিট তো আছেই। গতবছর অর্থাৎ ২০১৪ সালে মহা ধুমধামে পালিত হয়েছে শিল্পীর জন্মশতবর্ষ, তবে ওপার বাংলায়। এপারে বিশেষ কোনো খবর নেই। আমাদের একটু দেরিতে জাগা অভ্যাস। বাংলাদেশের নাগরিকরা এই শিল্পীকে ডাকেন 'শিল্পাচার্য' বলে, আমরা চিনি শিল্পী জয়নুল আবেদিন নামে।
তবে শুরুটা কিন্তু মোটেই এতো সহজ সরল ছিলো না।
১৯১৪ সালে বর্তমান বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার কিশোরগঞ্জে এক সহকারী সাব-ইন্সপেক্টরের ঘরে জন্মগ্রহণ করের জয়নুল আবেদিন। আর সাধারণ পাঁচটি শিশুর মতন এনার সম্পর্কে প্রতিবেশীদের ধারণা "এই ছেলে বড়জোর আফিস কেরানী হবে বটেক" থেকে বেশি কিছুই এগোয় নি। ম্যাটিক পরীক্ষার আগেই একাডেমিক পড়াশুনার পাঠ চুকিয়ে কলিকাতার গভর্নমেন্ট স্কুল অফ আর্টস-এ ভর্তি হন। পাঠ্যক্রমের শেষ বর্ষেই এই স্কুলের শিক্ষক হিসাবে নিযুক্ত হন। বাংলার দুর্ভিক্ষ (পঞ্চাশের মন্বন্তর) নিয়ে বিখ্যাত 'দুর্ভিক্ষের চিত্রমালা' আঁকেন ১৯৪৩ সালে। দেশভাগের পরে পূর্বপাকিস্তানে চলে আসেন।
১৯৫১ সালের আগষ্ট মাসে সরকারী বৃত্তি নিয়ে ইউরোপে যান জয়নুল আবেদিন। বছরাধিককাল ব্যাপী সেখানে শিল্পকলার পাঠ নেন, প্রদর্শনী করেন এবং বিশ্বখ্যাত সমালোচক দ্বারা প্রশংসিত হন। এই সময়ের উপলব্ধি প্রতিটি শিল্পীর শিক্ষণীয় ... "বিদেশে গিয়ে আমার দেশকে চিনতে হয়। বিট্রিশ মিউজিয়ামে বাংলাদেশের মূল লোকশিল্পের প্রায় প্রতিনিধিত্বমূলক সবগুলি নিদর্শন সংরক্ষিত আছে। ওগুলো না দেখলে নিজের দেশকে বুঝতেই পারতাম না। দেশকে আগে না বুঝে বিদেশে যাওয়া ঠিক নয়, তাহলে আমার মতো ঠোক্কর খেয়ে ফিরে আসতে হয়।"
উপলব্ধি মানুষকে তার লক্ষ্যস্থির করতে সাহায্য করেন। জয়নুলের মতন সংবেদনশীল শিল্পীর কাছে সেটা প্রত্যাশিত। ১৯৫২ -এর সেপ্টেম্বর মাসে দেশে ফিরলেন। ততদিনে বুঝে গেছেন দেশজ শিল্পকে আত্মস্থ করে আন্তর্জাতিকতায় পৌঁছানোই তাঁর লক্ষ্য। দেশে থাকতে যে কাজ তিনি শুরু করেছিলেন বিশ্বখ্যাত সমালোচক আর দর্শকদের প্রশংসা বাড়িয়েছে তাঁর আত্মবিশ্বাস।
১৯৫১-৫৩ সময়সীমাকে শিল্পসমালোচকরা চিহ্নিত করেছেন জয়নুল আবেদিনের 'বাঙালী আধুনিক ধারা'র ছবি আঁকার সূচনা হিসাবে। বস্তুত বিদেশযাত্রার পূর্বের তিনি পুরুষ্ট তুলির আঁচড়ে যে শিল্পধারা শুরু করেছিলেন, বিদেশ ভ্রমণ বিশেষ করে সংগ্রহশালা ও প্রদর্শনী কক্ষ ঘুরে সেই ধারণা আরো মজবুত করেন। দেশে ফিরে তিনি দুটি কাজ করলেন। এক, হাতে কলমে রসিক সমাজকে দেখালেন কিভাবে বাঙালী চিত্রকলার উত্তরণ ঘটানো সম্ভব। দুই, এক স্থায়ী 'লোকশিল্পের সংগ্রহশালা' নির্মাণের স্বপ্ন বাস্তবায়িত করা। সরকারি সহায়তায় তাঁর সেই স্বপ্ন পূরণ হয় মৃত্যুর ঠিক একবছর আগে । সোনারগাঁও -এ নির্মিত হয় 'বাংলাদেশ লোকজ চারু ও কারুকলা ফাউন্ডেশন'। পট, পুতুল, নকশীকাঁথা, শোলাশিল্প,পিতল শিল্প থেকে শুরু করে যাবতীয় লৌকিক শিল্পের নমুনা সংরক্ষণ করে গেলেন যা যুগ যুগ ধরে বাঙালী শিল্পী, শিল্পরসিক এবং পন্ডিতদের সমৃদ্ধ করবে।
নিজের অধ্যবসায়ে তিনি হয়ে উঠলেন সব অর্থে শিল্পী। পেয়েছেন দেশ-বিদেশের অসংখ্য পুরস্কার, খেতাব। সহযাত্রী শিল্পীদের সহযোগীতায় গড়েছেন 'চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়', লোকশিল্পের সংগ্রাহশালা, বাংলাদেশের সংবিধানের অঙ্গসজ্জা। মৃত্যু পরবর্তীকালে তাঁর আঁকা ছবি দেশের কাগজের মুদ্রা , ডাকটিকিট এবং পাসপোর্টে স্থান পেয়েছে, যা এপার বাংলার মহান শিল্পীদের কাছেও স্বপ্নস্বরূপ। আপামর দেশবাসী জয়নুল আবেদিনকে ভূষিত করেছেন 'বাংলাদেশের শিল্পাচার্য' বলে।
অমিত বিশ্বাস
কৃষ্ণনগর
চিত্র-আলোচনা :
সাঁওতাল দম্পতি (১৯৫১)
জলরঙে আঁকা এই ছবিতে দেখি একজোড়া মানব-মানবীকে। কোমর থেকে নিচের অংশ অনেকটাই বড়, সুগঠিত। সাধারণত মাটিতে বসা অবস্থায় দাঁড়ানো মানুষকে দেখলে যে অনুভূতি হয় অনেকটাই সেইরকম (low angle view)। এর সঙ্গে দিগন্তরেখা নেমে এসেছে পায়ের কাছে, ফলে মানবদুটি অপ্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ হয়েছে। ছবির শিরোনাম 'সাঁওতাল দম্পতি'। দূরের জঙ্গল, পশুপালক নর-নারী, গবাদীপশু থেকে শুরু করে পুরুষটির হাতের ধাগা, মাথার টোকা অথবা মানবীর মাথায় গোঁজা পলাশ ফুলটিও শিল্পীর দৃষ্টি এড়ায় না, তবে তার রূপকল্প সংক্ষেপিত।
গ্রাম্যমহিলা (১৯৫৩)
ছবিটির শিরোনাম 'বাঙালী নারী'(জাতীয় জাদুঘর, বাংলাদেশ) উপস্থাপনা প্রায় একই রকমের, বর্ণবিভাজন সামান্য আলাদা। এখানে লক্ষনীয় নারীটি মধ্যবয়স্ক। কিভাবে !!! উপস্থাপনা তো একই শুধু পার্থক্য নারীটির থুতনিতে জোড়া ভাঁজ (double chin) যা সাধারণত বনেদী বাড়ির দূর্গা/জগদ্ধাত্রী মূর্তিতে দেখা যায়, মাঝবয়সী মহিলা 'মা' এর প্রতিরূপ।
দুইজন সাঁওতাল রমণী (১৯৫১)
গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে দুই সাঁওতাল রমনী। একজন গাছে হাত দিয়ে দেহের ভর রেখেছে অপরজন ধরে আছে তাঁর কাঁধ। দ্বিতীয় রমনীটির বাম কাঁখে আছে চুবড়ি/ঝুড়ি। যদি আমরা এই ছবিটি বিশ্লেষণ করি তবে দেখব কী শক্তিশালী বীজ লুকিয়ে আছে। জলরঙে আঁকা ছবিটি হয়তো অতি সাধারণই চিত্রকলার নমুনা হিসাবে থেকে যেত যদি না ঋষিপ্রতিম শিল্পীর স্পর্শ পেত। হালকা ওয়াশের উপর তুলির বলিষ্ঠ টানে রেখানির্ভর ছবি এটি। সমান্তরাল দুটি গাছের একটিতে প্রথম মেয়েটির ডানহাত স্পর্শ করে রয়েছে। গাছদুটির মধ্যে জঙ্গলের সম্ভবনা লুকিয়ে আছে। সমতা সঞ্চারিত হয়েছে অপর মেয়েটির ডানহাতে। সেখান থেকে নিতম্বের কাপড়ের সীমারেখা একটি সপাট রেখাতে। ছবিটি দেখলে মনে হবে মেয়েদুটির নিন্মাঙ্গ ছবির সীমারেখায় স্পর্শ করে নেই, অথচ মজার বিষয় হল তারা শূন্যে ভাসমানও নয়। ছবির ভ্যলুম ছবিটিকে শক্ত জমি দিয়েছে। এবার আসি ছবিটির সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ দিকে। সামান্য কয়েকটি লালরঙের ছোট ছোট দলবদ্ধ পোঁচ/ছাপ। মেয়ে দুটির খোঁপাতে, পলাশফুলের অতিবিমূর্ত চিত্রকল্প, এক লহমায় ছবিটিকে অন্যতম সেরা ছবিতে পরিণত করল। পলাশফুল ফোটার সিজনে মানব মনে বয়ে যায় বসন্ত। গাছের আড়ালে দাঁড়ানো মেয়ে দুটি সেই বসন্তের আগমণে আহত ... অপেক্ষারত। সামান্য রঙের পোঁচ আর অনুভূতির পলাশফুল শিল্পশাস্ত্রের ভাষায় 'লাবণ্য' ছবিকে নতুন দর্শনে উত্তরণ ঘটায়।
দুর্ভিক্ষ চিত্র ১৩ (১৯৪৩)
কোনো ব্যক্তি হয়ত খাবার মোড়া কাগজটি ফেলে দিয়েছে অথবা সামান্য খাবার কোনোভাবে লেগেছিল কাগজটিতে, কংকালসার পুরুষটি সেই কাগজটি থেকে চেটে চেটে সম্পুর্ণ খাবারটি সংগ্রহ করছে। বর্তমানে কেয়ার অফ ফুটপাথ প্রতীকী ব্যক্তিটি হয়ত ছিলেন গ্রামের কোনো কৃষক, মানব নির্মিত দুর্ভিক্ষের দৃশ্যত দলিল নির্মাণ করেছেন শিল্পী। প্রসঙ্গ জানাই শিল্পী জয়নুল আবেদিন এই চিত্রমালাগুলি কোনোদিন হাতছাড়া করেন নি, যাযাবরের মতন যেখানেই গেছেন সঙ্গে থেকেছে এই জীবন্ত দলিল।
![]() |
| Zainul Abedin at his studio |
বুধের গায়ে গর্ত, আর সেই গর্তের নামকরণ হয়েছে কোনো বাঙালি চিত্রশিল্পীর নামে, এতোটা সৌভাগ্য এপার বাংলার ক'জন শিল্পীর ভাগ্যে জোটে ? বড়জোর জন্মশতবর্ষে একখানা 'ডাকটিকিট' আর কয়েকটি প্রবন্ধ আর একটি 'রেট্রো'। সেই তুলনায় ইনি বেশ ভাগ্যবান, কাগজের মুদ্রায় (আমাদের দেশে তো সেই লাঠি হাতে বৃদ্ধ ছাড়া কারোর কথাই ভাবা হয় না) ছাপা হয়েছে তাঁর আঁকা ছবি, পাসপোর্ট ও ডাকটিকিট তো আছেই। গতবছর অর্থাৎ ২০১৪ সালে মহা ধুমধামে পালিত হয়েছে শিল্পীর জন্মশতবর্ষ, তবে ওপার বাংলায়। এপারে বিশেষ কোনো খবর নেই। আমাদের একটু দেরিতে জাগা অভ্যাস। বাংলাদেশের নাগরিকরা এই শিল্পীকে ডাকেন 'শিল্পাচার্য' বলে, আমরা চিনি শিল্পী জয়নুল আবেদিন নামে।
তবে শুরুটা কিন্তু মোটেই এতো সহজ সরল ছিলো না।
১৯১৪ সালে বর্তমান বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার কিশোরগঞ্জে এক সহকারী সাব-ইন্সপেক্টরের ঘরে জন্মগ্রহণ করের জয়নুল আবেদিন। আর সাধারণ পাঁচটি শিশুর মতন এনার সম্পর্কে প্রতিবেশীদের ধারণা "এই ছেলে বড়জোর আফিস কেরানী হবে বটেক" থেকে বেশি কিছুই এগোয় নি। ম্যাটিক পরীক্ষার আগেই একাডেমিক পড়াশুনার পাঠ চুকিয়ে কলিকাতার গভর্নমেন্ট স্কুল অফ আর্টস-এ ভর্তি হন। পাঠ্যক্রমের শেষ বর্ষেই এই স্কুলের শিক্ষক হিসাবে নিযুক্ত হন। বাংলার দুর্ভিক্ষ (পঞ্চাশের মন্বন্তর) নিয়ে বিখ্যাত 'দুর্ভিক্ষের চিত্রমালা' আঁকেন ১৯৪৩ সালে। দেশভাগের পরে পূর্বপাকিস্তানে চলে আসেন।
১৯৫১ সালের আগষ্ট মাসে সরকারী বৃত্তি নিয়ে ইউরোপে যান জয়নুল আবেদিন। বছরাধিককাল ব্যাপী সেখানে শিল্পকলার পাঠ নেন, প্রদর্শনী করেন এবং বিশ্বখ্যাত সমালোচক দ্বারা প্রশংসিত হন। এই সময়ের উপলব্ধি প্রতিটি শিল্পীর শিক্ষণীয় ... "বিদেশে গিয়ে আমার দেশকে চিনতে হয়। বিট্রিশ মিউজিয়ামে বাংলাদেশের মূল লোকশিল্পের প্রায় প্রতিনিধিত্বমূলক সবগুলি নিদর্শন সংরক্ষিত আছে। ওগুলো না দেখলে নিজের দেশকে বুঝতেই পারতাম না। দেশকে আগে না বুঝে বিদেশে যাওয়া ঠিক নয়, তাহলে আমার মতো ঠোক্কর খেয়ে ফিরে আসতে হয়।"
উপলব্ধি মানুষকে তার লক্ষ্যস্থির করতে সাহায্য করেন। জয়নুলের মতন সংবেদনশীল শিল্পীর কাছে সেটা প্রত্যাশিত। ১৯৫২ -এর সেপ্টেম্বর মাসে দেশে ফিরলেন। ততদিনে বুঝে গেছেন দেশজ শিল্পকে আত্মস্থ করে আন্তর্জাতিকতায় পৌঁছানোই তাঁর লক্ষ্য। দেশে থাকতে যে কাজ তিনি শুরু করেছিলেন বিশ্বখ্যাত সমালোচক আর দর্শকদের প্রশংসা বাড়িয়েছে তাঁর আত্মবিশ্বাস।
১৯৫১-৫৩ সময়সীমাকে শিল্পসমালোচকরা চিহ্নিত করেছেন জয়নুল আবেদিনের 'বাঙালী আধুনিক ধারা'র ছবি আঁকার সূচনা হিসাবে। বস্তুত বিদেশযাত্রার পূর্বের তিনি পুরুষ্ট তুলির আঁচড়ে যে শিল্পধারা শুরু করেছিলেন, বিদেশ ভ্রমণ বিশেষ করে সংগ্রহশালা ও প্রদর্শনী কক্ষ ঘুরে সেই ধারণা আরো মজবুত করেন। দেশে ফিরে তিনি দুটি কাজ করলেন। এক, হাতে কলমে রসিক সমাজকে দেখালেন কিভাবে বাঙালী চিত্রকলার উত্তরণ ঘটানো সম্ভব। দুই, এক স্থায়ী 'লোকশিল্পের সংগ্রহশালা' নির্মাণের স্বপ্ন বাস্তবায়িত করা। সরকারি সহায়তায় তাঁর সেই স্বপ্ন পূরণ হয় মৃত্যুর ঠিক একবছর আগে । সোনারগাঁও -এ নির্মিত হয় 'বাংলাদেশ লোকজ চারু ও কারুকলা ফাউন্ডেশন'। পট, পুতুল, নকশীকাঁথা, শোলাশিল্প,পিতল শিল্প থেকে শুরু করে যাবতীয় লৌকিক শিল্পের নমুনা সংরক্ষণ করে গেলেন যা যুগ যুগ ধরে বাঙালী শিল্পী, শিল্পরসিক এবং পন্ডিতদের সমৃদ্ধ করবে।
নিজের অধ্যবসায়ে তিনি হয়ে উঠলেন সব অর্থে শিল্পী। পেয়েছেন দেশ-বিদেশের অসংখ্য পুরস্কার, খেতাব। সহযাত্রী শিল্পীদের সহযোগীতায় গড়েছেন 'চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়', লোকশিল্পের সংগ্রাহশালা, বাংলাদেশের সংবিধানের অঙ্গসজ্জা। মৃত্যু পরবর্তীকালে তাঁর আঁকা ছবি দেশের কাগজের মুদ্রা , ডাকটিকিট এবং পাসপোর্টে স্থান পেয়েছে, যা এপার বাংলার মহান শিল্পীদের কাছেও স্বপ্নস্বরূপ। আপামর দেশবাসী জয়নুল আবেদিনকে ভূষিত করেছেন 'বাংলাদেশের শিল্পাচার্য' বলে।
অমিত বিশ্বাস
কৃষ্ণনগর
চিত্র-আলোচনা :
সাঁওতাল দম্পতি (১৯৫১)
জলরঙে আঁকা এই ছবিতে দেখি একজোড়া মানব-মানবীকে। কোমর থেকে নিচের অংশ অনেকটাই বড়, সুগঠিত। সাধারণত মাটিতে বসা অবস্থায় দাঁড়ানো মানুষকে দেখলে যে অনুভূতি হয় অনেকটাই সেইরকম (low angle view)। এর সঙ্গে দিগন্তরেখা নেমে এসেছে পায়ের কাছে, ফলে মানবদুটি অপ্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ হয়েছে। ছবির শিরোনাম 'সাঁওতাল দম্পতি'। দূরের জঙ্গল, পশুপালক নর-নারী, গবাদীপশু থেকে শুরু করে পুরুষটির হাতের ধাগা, মাথার টোকা অথবা মানবীর মাথায় গোঁজা পলাশ ফুলটিও শিল্পীর দৃষ্টি এড়ায় না, তবে তার রূপকল্প সংক্ষেপিত।
গ্রাম্যমহিলা (১৯৫৩)
ছবিটির শিরোনাম 'বাঙালী নারী'(জাতীয় জাদুঘর, বাংলাদেশ) উপস্থাপনা প্রায় একই রকমের, বর্ণবিভাজন সামান্য আলাদা। এখানে লক্ষনীয় নারীটি মধ্যবয়স্ক। কিভাবে !!! উপস্থাপনা তো একই শুধু পার্থক্য নারীটির থুতনিতে জোড়া ভাঁজ (double chin) যা সাধারণত বনেদী বাড়ির দূর্গা/জগদ্ধাত্রী মূর্তিতে দেখা যায়, মাঝবয়সী মহিলা 'মা' এর প্রতিরূপ।
দুইজন সাঁওতাল রমণী (১৯৫১)
গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে দুই সাঁওতাল রমনী। একজন গাছে হাত দিয়ে দেহের ভর রেখেছে অপরজন ধরে আছে তাঁর কাঁধ। দ্বিতীয় রমনীটির বাম কাঁখে আছে চুবড়ি/ঝুড়ি। যদি আমরা এই ছবিটি বিশ্লেষণ করি তবে দেখব কী শক্তিশালী বীজ লুকিয়ে আছে। জলরঙে আঁকা ছবিটি হয়তো অতি সাধারণই চিত্রকলার নমুনা হিসাবে থেকে যেত যদি না ঋষিপ্রতিম শিল্পীর স্পর্শ পেত। হালকা ওয়াশের উপর তুলির বলিষ্ঠ টানে রেখানির্ভর ছবি এটি। সমান্তরাল দুটি গাছের একটিতে প্রথম মেয়েটির ডানহাত স্পর্শ করে রয়েছে। গাছদুটির মধ্যে জঙ্গলের সম্ভবনা লুকিয়ে আছে। সমতা সঞ্চারিত হয়েছে অপর মেয়েটির ডানহাতে। সেখান থেকে নিতম্বের কাপড়ের সীমারেখা একটি সপাট রেখাতে। ছবিটি দেখলে মনে হবে মেয়েদুটির নিন্মাঙ্গ ছবির সীমারেখায় স্পর্শ করে নেই, অথচ মজার বিষয় হল তারা শূন্যে ভাসমানও নয়। ছবির ভ্যলুম ছবিটিকে শক্ত জমি দিয়েছে। এবার আসি ছবিটির সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ দিকে। সামান্য কয়েকটি লালরঙের ছোট ছোট দলবদ্ধ পোঁচ/ছাপ। মেয়ে দুটির খোঁপাতে, পলাশফুলের অতিবিমূর্ত চিত্রকল্প, এক লহমায় ছবিটিকে অন্যতম সেরা ছবিতে পরিণত করল। পলাশফুল ফোটার সিজনে মানব মনে বয়ে যায় বসন্ত। গাছের আড়ালে দাঁড়ানো মেয়ে দুটি সেই বসন্তের আগমণে আহত ... অপেক্ষারত। সামান্য রঙের পোঁচ আর অনুভূতির পলাশফুল শিল্পশাস্ত্রের ভাষায় 'লাবণ্য' ছবিকে নতুন দর্শনে উত্তরণ ঘটায়।
দুর্ভিক্ষ চিত্র ১৩ (১৯৪৩)
কোনো ব্যক্তি হয়ত খাবার মোড়া কাগজটি ফেলে দিয়েছে অথবা সামান্য খাবার কোনোভাবে লেগেছিল কাগজটিতে, কংকালসার পুরুষটি সেই কাগজটি থেকে চেটে চেটে সম্পুর্ণ খাবারটি সংগ্রহ করছে। বর্তমানে কেয়ার অফ ফুটপাথ প্রতীকী ব্যক্তিটি হয়ত ছিলেন গ্রামের কোনো কৃষক, মানব নির্মিত দুর্ভিক্ষের দৃশ্যত দলিল নির্মাণ করেছেন শিল্পী। প্রসঙ্গ জানাই শিল্পী জয়নুল আবেদিন এই চিত্রমালাগুলি কোনোদিন হাতছাড়া করেন নি, যাযাবরের মতন যেখানেই গেছেন সঙ্গে থেকেছে এই জীবন্ত দলিল।
সামনের দুইপায়ের মধ্যে গুঁজে রাখা মাথাটি শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে উপরে তোলার চেষ্টা করছে পশুটি, বাঁপাশের পা দুটি দৃশ্যমান এবং ডানপাশের পা দুটি ইশারায় বর্তমান। বাধা শুধু গলায় সংযুক্ত দড়িটি। প্রতিবাদী লেজটিও যেন দৃঢ়ভাবে ক্ষুদ্ধ। দৃশ্যত দুধথলিটি পশুটির লিঙ্গ নির্ধারণ করছে।। জলরঙের হালকা টানের উপর বলিষ্ঠ তুলির পুরুষ্ট সীমারেখায় আঁকা গাইগরুর এই ছবিটির শিরোনাম 'বিদ্রোহী'। রচনাকাল ১৯৫১, শিল্পী জয়নুল আবেদিন। ছবিটি পরবর্তীকালে প্রতীকে পরিণত হয়, যা ছিলো স্বাভাবিক।
জয়নুল আবেদিনের চোখে কাক 'ধান্দাবাজ' এর প্রতীক, শিল্পী নিজে কাক পছন্দ করতেন না। দুর্ভিক্ষের এই ছবিটিতে একটি শীর্ণ শিশুর দেখা মেলে, অনাহারে মৃত প্রায়, একটি কাক অসহায়তার সুযোগ নিয়ে নজর এড়িয়ে খাবার খুঁটে নিচ্ছে। ছবিটির প্রতীকী তাৎপর্য দর্শকের মনে দুর্ভিক্ষের আসল রূপ অনুভব করে নেয়।
গালে হাত দিয়ে পিতা-পুত্র ফেরীঘাটে অধৈর্যের অপেক্ষা ... বিশদ বিবরণ এই ছবির স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে ক্ষতিকারক।
নৈসর্গিক সৌন্দর্যের সঙ্গে স্মৃতির মেলবন্ধনে সৃষ্ট এই ছবিটি অনন্য। যদিও এই জাতীয় ছবি খুব বেশি দেখা মেলেনি শিল্পীর সারাজীবনের কাজে। বাংলাদেশে যে বিমূর্তচেতনার ঢেউ উঠেছিল এটি তারই ফসল। অনুমান করা যায় শিল্পী সম্পূর্ণ বিমূর্তে বিলীন হতে চান নি হয়ত।
শিল্পী জয়নুল আবেদিনের শেষ শিল্পকর্ম, মৃত্যুর কয়েকদিন আগে সৃষ্টি। এ সম্পর্কে বিশদ বিবরণ নিষ্প্রয়োজন।
সংগ্রাম (১৯৭৬)
শিল্পীকে হতে হয় উদার, নতুন কিছু গ্রহণের ক্ষমতা, নিজ সমাজ সংস্কার দর্শন সম্পর্কে সঠিক ধারণা। শিল্পী কখনই গজদন্ত মিনারে বসবাসকারী কাল্পনিক ব্যক্তি নন। মাটির গন্ধ না রইলে তো তাঁর সৃষ্টি বৃথা। এই প্রসঙ্গে একটি ছবির কথা বলতেই হয়। কাঠের গুড়ি বোঝাই একটি গরুরগাড়ী কাদায় আটকে গেছে। জোয়াল লাগানো বলদ দুটি এবং চালক আপ্রাণ চেষ্টা করছে গাড়িটিকে এমতা অবস্থা থেকে উদ্ধার করতে। মানুষ এবং পশু উভয়ের পায়ের অনেকাংশই কাদায় ডুবে কিন্তু কেউই পরাজয় স্বীকার না করে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে । ছবিটির উপযুক্ত শিরোনাম 'সংগ্রাম' ... মানবচেতনার জীবনবোধের দলিল। ছবিটি এতটাই জনপ্রিয় হয় যে পরবর্তীকালে জয়নুল এটিকে একাধিকবার পটে রূপ দেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য কৃষ্ণনগরের মাটির পুতুল গড়া হয়েছিলো এই ছবিটির অনুলিপি দেখে, যা আমরা আমাদের ছোটবেলায় দেখেছিলাম। টেম্পারা ও তেলরঙ উভয় মাধ্যমেই ছবিটি আঁকা হয়েছিলো। জোরালো রেখাই ছিলো বলদদুটি এবং মানুষটির সংগ্রামের প্রতীকি টেনশন। টেম্পারায় কৃত ছবিটি ১৯৫৪ সালে আঁকা জয়নুল সংগ্রহশালায় এবং তেলরঙ কৃত ১৯৭৬ সালে আঁকা ছবিটি জাতীয় সংগ্রাহশালা(বাংলাদেশ), সংরক্ষিত আছে ।












nice.............
ReplyDeleteধন্যবাদ ভাই চিন্ময় :)
DeleteDarun
ReplyDelete:) dear Marisol :)
DeleteSatty apurboooooo......
ReplyDeleteঅনেক ধন্যবাদ সময় করে পড়ার জন্য রথীনদা
DeleteCongratulation for necessary information & documentation
ReplyDeleteসাহস পেলাম দেবাশিষদা ... শুভেচ্ছা
Deleteদারুণ ।
ReplyDeleteধন্যবাদ তন্ময়দা
Delete