প্রেমচেতনায় পলাশ
পলাশগাছ জন্মায় বাংলার রুক্ষ ভূমিতে, যত্নের বিন্দুমাত্র প্রয়োজন হয় না। আপনা আপনি বড় হয় এই প্রকৃতির বুকে। পলাশের দুটি রূপ আমাদের কাছে পরিচিত, একটি বর্ষাকালে সবুজে সবুজ আর একটি বসন্তে ...যেন মনে হয় জঙ্গলে আগুন লেগেছে। এই আগুন সেইসময় মানুষের মনেও লাগে, তবে কামনার নয় প্রেমের। শিল্পীকুলের আগ্রহ তাই পলাশ এবং পলাশফুলকে নিয়ে। আসুন দেখি এইপর্বে বাংলাদেশের দুই প্রখ্যাত শিল্পী ঠিক কি চোখে দেখেছেন, অনুভব করেছেন পলাশ অনুষঙ্গকে। প্রবন্ধ শুরুতে বলে রাখা ভালো যে এখানে ইচ্ছাকৃতভাবে দুই শিল্পীকে নির্বাচন করা হয়েছে যাদের দৈহিক এবং মানসিক গঠন ভিন্ন এমনকি এনারা ভিন্ন সময়ের অধিবাসী। আসুন অনুভব করার চেষ্টা করি বসন্তে পলাশফুল ভিন্ন ভিন্ন সময়ের শিল্পীদের অবচেতন মনে ঠিক কি রঙ ধরায় ...
এক
একফালি পড়ন্ত রোদ, চারজন সাঁওতাল নারী আর অসংখ্য পলাশফুল ... এই দিয়ে কি শিল্প নির্মাণ সম্ভব ? সালটা ১৯৪৮, সদ্য স্থায়ীভাবে বাংলাভাগ সম্পন্ন করেছেন রাজনৈতিক পুরোহিতরা। এর মধ্যে শিল্পীর ডাক পড়েছে করাচীতে গিয়ে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের তথ্য ও বেতার বিভাগের প্রচার শাখার আর্ট ডিজাইনার এর দায়িত্বভার সামলানোর। অথচ শিল্পীর সেই মূহুর্তের একমাত্র মনোবাসনা, ঢাকায় চারুকলা ইনস্টিটিউট স্থাপনা। টানাপোড়েনের সেই সময়ের মধ্যে সৃষ্টি এই শিল্পকর্মটি, জানা যায় না ঢাকা বা করাচী ঠিক কোথায় বসে শিল্পী তেলরঙে এই ছবিটি এঁকেছেন। তারিখবিহীন ছবিটির অজানা সংগ্রাহক বর্তমানে পাকিস্তান নিবাসী, তাই যোগাযোগ অসম্ভব। তাহলে আসুন দেখি ছবি পাঠ করে কিছু পাই কিনা। এই দেখুন শিল্পীর নামটাই বলা হয় নি ... আলোচিত প্রথম শিল্পী হলেন বাংলাদেশের শিল্পাচার্য শ্রদ্ধেয় জয়নুল আবেদিন মহাশয়, শিল্পকর্মের শিরোনাম 'পলাশবনে সাঁওতাল নারী'।
চিত্রপটের বামদিক থেকে আমরা দেখতে পাই চারজন সাঁওতাল বিভিন্ন ভঙ্গিতে খোঁপা বাঁধতে ব্যস্ত, সঠিকভাবে বললে পলাশফুল দিয়ে সাজাতে ব্যস্ত। রমণীদের দেহভঙ্গিমা একটু খেয়াল করলেই বুঝতে পারবে তৎকালীন কলিকাতার আর্ট স্কুলে পাশ্চাত্য পদ্ধতিতে যেভাবে ফিগার স্টাডি করা হয় ঠিক সেইভাবে অর্থাৎ একটি দেহপ্রতিমাকে বিভিন্ন ভঙ্গী ও কোণ থেকে আঁকা হয়েছে এবং চিত্রপটে কম্পোজিশান অনুযায়ী সাজানো হয়েছে। তুলির চলন এখানে অনেকটাই শিল্পীর বিখ্যাত 'দুর্ভিক্ষ সিরিজ' -এর মত পুরুষ্ট টানে। ছবিটির পশ্চাদপটে প্রায় টানারঙেই আনা হয়েছে পড়ন্ত দুপুরের রোদ্দুরের অনুভব। আর মাঝখানে ফুটে রয়েছে অসংখ্য থোকা থোকা পলাশফুল, গাছের অস্তিত্ব বলতে ইশারায় গাছের ডাল আঁকা হয়েছে মাত্র।
এইবার চিত্রপটে ছড়ানো টুকরো টুকরো সংকেতগুলি জোড়া যাক। প্রথম নারীটি দর্শকের দিকে পিছন ফিরে, দ্বিতীয় নারীটি পাশ ফিরে নিচু হয়ে বসে আছেন যদিও তাঁর মুখ আমরা দেখতে পাচ্ছি না। তৃতীয় নারীটি তৃতীয়-চতুর্থাংশ দর্শকের দিকে থাকলেও পরিষ্কার বোঝা যায় সে নিজেকে সাজাতে ব্যস্ত, আর চতুর্থজন পিছন ফিরেই চুলের খোঁপায় পলাশফুল সাজাতে ব্যস্ত। এখানে লক্ষ করুন চতুর্থজনের উপস্থিত, প্রথম তিনজনকে দেখলে মনে হবে তারা একই নারীর পরপর কয়েকটি মুহূর্তের প্রতিরূপ। শিল্পীর অনন্য উপস্থাপনা দেখুন, চতুর্থ সাঁওতাল নারীকে আগের তিনজনের সঙ্গে একই সারিতে না রেখে সামান্য পিছনে উপস্থাপনা করেছেন ... ফলে চিত্রপটে চারটি নারীর উপস্থিতিই অনুভব হয়। এইবার এই সঙ্গে যোগ দিন পড়ন্ত বেলার রোদ ... অর্থাৎ সারাদিনের কাজের শেষে সামান্য আমোদপ্রমোদের আয়োজন। ছবিটা তো এখানেই শেষ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু না। শিল্পী পড়ন্ত রোদ আর সাঁওতাল নারীদের মধ্যে আঁকলেন ডালে ফুটে থাকা থোকা থোকা পলাশফুল। এক লহমায় ছবিটির উত্তরণ ঘটলো। পলাশের আগমনে চিত্রপট বদলে গেল ... সামান্য আমোদ প্রমোদ রূপান্তরিত হলো বসন্তের প্রেমচেতনা সমৃদ্ধ সাঁওতাল নারীদের নৃত্যপ্রস্তুতি পর্ব। সার্থক শিল্পরচনা অর্থাৎ মাষ্টারপিস বোধহয় একেই বলে।
আরো একটু আছে। জয়নুল সাহেবের চারশোর কিছু অধিক ছবির প্রিন্ট লেখকের দেখার সৌভাগ্য হয়েছে কিন্তু সাধারণত শিল্পী যে ধরণের কম্পোজিশান তাঁর চিত্ররচনায় ব্যবহার করেন এটি তার থেকে বেশ খানিকটাই আলাদা। একই বছর আমরা দেখি শিল্পী ইমপ্যাষ্টো পদ্ধতিতে পাশ্চাত্য রচনাশৈলী অনুসারে বেশ কিছু ছবি এঁকেছেন যখন তিনি শশুরালয়ে ছিলেন এবং ১০০টি পোষ্টার বিষয় 'ভারতবর্ষে মুসলিম কৃতিত্ব'। আলোচিত ছবিটি এই দুই শৈলীর কোনোটার সঙ্গে মিল খায় না অথচ মিল আছে চরিত্রগত দিক দিয়ে 'করাচির স্কেচমালা'র সঙ্গে অর্থাৎ একই বিষয় নিয়ে একাধিক রেখাচিত্র অংকন। সুতরাং একটা সম্ভবনা থেকেই যায় ডিটেলবর্জিত এই ছবিটি সম্ভবত করাচীতে বসেই স্মৃতি থেকে আঁকেন শিল্পী, যখন তিনি চেতনায় অভাব বোধ করছেন বাংলার বসন্তকে এবং অবশ্যই পরিবারকে।
দুই
'প্রকৃতি' (মৎসকন্যা সিরিজ, ২০০৭) শিরোনামের ছবিটি নিয়ে সামান্য সংশয় ছিল বাংলাদেশের এইসময়কার প্রতিনিধিত্বকারী শিল্পী রোকেয়া সুলতানার মনে ... না ছবিটির সৃষ্টির সফলতা নিয়ে নয়, সংশয় ছিল দর্শকসাধারণের মধ্যবিত্ত মানসিক মনোবৃত্তি নিয়ে। রোকেয়া দিদিভায়ের অন্যান্য ছবিগুলির মতন এটিও বিমূর্ত নিসর্গের অন্তর্ভূক্ত, যার মধ্যে ছড়িয়ে আছে নারী-প্রকৃতি-আত্ম্নির্মাণের নির্যাস। বড়মাপের টেম্পারায় (৭২"/৩৬") কাজ নামানো যে কতটা কঠিন এবং দুঃসাধ্য তা একমাত্র ভুক্তভোগী শিল্পীমাত্রেই জানেন। ছবিটির ঠিক মধ্যেখানে মৎসকন্যার অবস্থান ... তাঁর কোমর-পরবর্তী অংশ ধীরে ধীরে পা থেকে মাছের লেজে পরিণত হচ্ছে। উপরের অংশে ইশারায় উর্বর স্তনদ্বয় ছাড়িয়ে হাত দুইখানি বৃক্ষ তথা প্রকৃতিতে রূপান্তরিত। ছবিটিতে প্রধান দুটি রঙ হল সামুদ্রিক নীল এবং প্রাকৃতিক সবুজ, ছড়ানো হয়েছে অনেকটা তরল রঙের অ্যাক্সিডেন্টাল কন্টোলিং পদ্ধতিতে। পদ্ধতির দিক থেকে এটি বেশ জটিল এবং অভিজ্ঞ শৈল্পিক কার্যকলাপের মধ্যে পড়ে। সেই সঙ্গে শিল্পী জুড়েছেন জমিনে ছাপচিত্রের নির্যাস, রেখা হয়েছে উদ্দীপনাময় অথচ মার্জিত এবং নিয়ন্ত্রিত। এইটুকু পাঠের পরেও কিন্তু পরিষ্কার হয় না মৎসকন্যার মনোবাসনা বা ছবিটির অন্তনিহিত বার্তা সম্পর্কে। এবার ছবিটির ঠিক উপরে মৎসকন্যার হাতের মুদ্রার দিকে নজর ফেলব ... দেখুন সে দুইহাত ভরে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে লালচে-কমলা পলাশকে। পলাশের গঠনও সামান্য আলাদা ... অনুমান করা যায় এটি শিল্পীর কলাভবন (শান্তিনিকেতন) এবং রাবীন্দ্রিক চিত্রকলা পাঠের অভিজ্ঞতা। এবার নিশ্চিত অনুভবে আসে পলাশচেতনায় ধীরে ধীরে মৎসকন্যার জীবনে আসছে প্রেমচেতনা সমৃদ্ধ বসন্তরাগ।
পলাশ মানবচেতনার নিয়ে আসে শাশ্বত প্রেম, উৎসবের মেজাজ আর রুক্ষ প্রকৃতি তথা জীবনে আনন্দের ছোঁয়া। বাঙালী হিসাবে তাই আমরা আশা করি যতদিন পলাশ থাকবে, ক্রিয়াশীল রইবে সৃষ্টিশীল মানবমন।
অমিত বিশ্বাস
কৃষ্ণনগর
তথ্যসূত্র :
১। Great Masters of Bangladesh : Zainul Abedin, Bengal Foundation.
২। জয়নুল আবেদিন : সৃষ্টিশীল জীবনসমগ্র, সৈয়দ আজিজুল হক
৩। শিল্পীপুত্র (কনিষ্ঠ) মইনুল আবেদিনের সঙ্গে আলাপচারী।
৪। শিল্পী রোকেয়া সুলতানার সঙ্গে আলাপচারী।
পলাশগাছ জন্মায় বাংলার রুক্ষ ভূমিতে, যত্নের বিন্দুমাত্র প্রয়োজন হয় না। আপনা আপনি বড় হয় এই প্রকৃতির বুকে। পলাশের দুটি রূপ আমাদের কাছে পরিচিত, একটি বর্ষাকালে সবুজে সবুজ আর একটি বসন্তে ...যেন মনে হয় জঙ্গলে আগুন লেগেছে। এই আগুন সেইসময় মানুষের মনেও লাগে, তবে কামনার নয় প্রেমের। শিল্পীকুলের আগ্রহ তাই পলাশ এবং পলাশফুলকে নিয়ে। আসুন দেখি এইপর্বে বাংলাদেশের দুই প্রখ্যাত শিল্পী ঠিক কি চোখে দেখেছেন, অনুভব করেছেন পলাশ অনুষঙ্গকে। প্রবন্ধ শুরুতে বলে রাখা ভালো যে এখানে ইচ্ছাকৃতভাবে দুই শিল্পীকে নির্বাচন করা হয়েছে যাদের দৈহিক এবং মানসিক গঠন ভিন্ন এমনকি এনারা ভিন্ন সময়ের অধিবাসী। আসুন অনুভব করার চেষ্টা করি বসন্তে পলাশফুল ভিন্ন ভিন্ন সময়ের শিল্পীদের অবচেতন মনে ঠিক কি রঙ ধরায় ...
এক
একফালি পড়ন্ত রোদ, চারজন সাঁওতাল নারী আর অসংখ্য পলাশফুল ... এই দিয়ে কি শিল্প নির্মাণ সম্ভব ? সালটা ১৯৪৮, সদ্য স্থায়ীভাবে বাংলাভাগ সম্পন্ন করেছেন রাজনৈতিক পুরোহিতরা। এর মধ্যে শিল্পীর ডাক পড়েছে করাচীতে গিয়ে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের তথ্য ও বেতার বিভাগের প্রচার শাখার আর্ট ডিজাইনার এর দায়িত্বভার সামলানোর। অথচ শিল্পীর সেই মূহুর্তের একমাত্র মনোবাসনা, ঢাকায় চারুকলা ইনস্টিটিউট স্থাপনা। টানাপোড়েনের সেই সময়ের মধ্যে সৃষ্টি এই শিল্পকর্মটি, জানা যায় না ঢাকা বা করাচী ঠিক কোথায় বসে শিল্পী তেলরঙে এই ছবিটি এঁকেছেন। তারিখবিহীন ছবিটির অজানা সংগ্রাহক বর্তমানে পাকিস্তান নিবাসী, তাই যোগাযোগ অসম্ভব। তাহলে আসুন দেখি ছবি পাঠ করে কিছু পাই কিনা। এই দেখুন শিল্পীর নামটাই বলা হয় নি ... আলোচিত প্রথম শিল্পী হলেন বাংলাদেশের শিল্পাচার্য শ্রদ্ধেয় জয়নুল আবেদিন মহাশয়, শিল্পকর্মের শিরোনাম 'পলাশবনে সাঁওতাল নারী'।
চিত্রপটের বামদিক থেকে আমরা দেখতে পাই চারজন সাঁওতাল বিভিন্ন ভঙ্গিতে খোঁপা বাঁধতে ব্যস্ত, সঠিকভাবে বললে পলাশফুল দিয়ে সাজাতে ব্যস্ত। রমণীদের দেহভঙ্গিমা একটু খেয়াল করলেই বুঝতে পারবে তৎকালীন কলিকাতার আর্ট স্কুলে পাশ্চাত্য পদ্ধতিতে যেভাবে ফিগার স্টাডি করা হয় ঠিক সেইভাবে অর্থাৎ একটি দেহপ্রতিমাকে বিভিন্ন ভঙ্গী ও কোণ থেকে আঁকা হয়েছে এবং চিত্রপটে কম্পোজিশান অনুযায়ী সাজানো হয়েছে। তুলির চলন এখানে অনেকটাই শিল্পীর বিখ্যাত 'দুর্ভিক্ষ সিরিজ' -এর মত পুরুষ্ট টানে। ছবিটির পশ্চাদপটে প্রায় টানারঙেই আনা হয়েছে পড়ন্ত দুপুরের রোদ্দুরের অনুভব। আর মাঝখানে ফুটে রয়েছে অসংখ্য থোকা থোকা পলাশফুল, গাছের অস্তিত্ব বলতে ইশারায় গাছের ডাল আঁকা হয়েছে মাত্র।
এইবার চিত্রপটে ছড়ানো টুকরো টুকরো সংকেতগুলি জোড়া যাক। প্রথম নারীটি দর্শকের দিকে পিছন ফিরে, দ্বিতীয় নারীটি পাশ ফিরে নিচু হয়ে বসে আছেন যদিও তাঁর মুখ আমরা দেখতে পাচ্ছি না। তৃতীয় নারীটি তৃতীয়-চতুর্থাংশ দর্শকের দিকে থাকলেও পরিষ্কার বোঝা যায় সে নিজেকে সাজাতে ব্যস্ত, আর চতুর্থজন পিছন ফিরেই চুলের খোঁপায় পলাশফুল সাজাতে ব্যস্ত। এখানে লক্ষ করুন চতুর্থজনের উপস্থিত, প্রথম তিনজনকে দেখলে মনে হবে তারা একই নারীর পরপর কয়েকটি মুহূর্তের প্রতিরূপ। শিল্পীর অনন্য উপস্থাপনা দেখুন, চতুর্থ সাঁওতাল নারীকে আগের তিনজনের সঙ্গে একই সারিতে না রেখে সামান্য পিছনে উপস্থাপনা করেছেন ... ফলে চিত্রপটে চারটি নারীর উপস্থিতিই অনুভব হয়। এইবার এই সঙ্গে যোগ দিন পড়ন্ত বেলার রোদ ... অর্থাৎ সারাদিনের কাজের শেষে সামান্য আমোদপ্রমোদের আয়োজন। ছবিটা তো এখানেই শেষ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু না। শিল্পী পড়ন্ত রোদ আর সাঁওতাল নারীদের মধ্যে আঁকলেন ডালে ফুটে থাকা থোকা থোকা পলাশফুল। এক লহমায় ছবিটির উত্তরণ ঘটলো। পলাশের আগমনে চিত্রপট বদলে গেল ... সামান্য আমোদ প্রমোদ রূপান্তরিত হলো বসন্তের প্রেমচেতনা সমৃদ্ধ সাঁওতাল নারীদের নৃত্যপ্রস্তুতি পর্ব। সার্থক শিল্পরচনা অর্থাৎ মাষ্টারপিস বোধহয় একেই বলে।
আরো একটু আছে। জয়নুল সাহেবের চারশোর কিছু অধিক ছবির প্রিন্ট লেখকের দেখার সৌভাগ্য হয়েছে কিন্তু সাধারণত শিল্পী যে ধরণের কম্পোজিশান তাঁর চিত্ররচনায় ব্যবহার করেন এটি তার থেকে বেশ খানিকটাই আলাদা। একই বছর আমরা দেখি শিল্পী ইমপ্যাষ্টো পদ্ধতিতে পাশ্চাত্য রচনাশৈলী অনুসারে বেশ কিছু ছবি এঁকেছেন যখন তিনি শশুরালয়ে ছিলেন এবং ১০০টি পোষ্টার বিষয় 'ভারতবর্ষে মুসলিম কৃতিত্ব'। আলোচিত ছবিটি এই দুই শৈলীর কোনোটার সঙ্গে মিল খায় না অথচ মিল আছে চরিত্রগত দিক দিয়ে 'করাচির স্কেচমালা'র সঙ্গে অর্থাৎ একই বিষয় নিয়ে একাধিক রেখাচিত্র অংকন। সুতরাং একটা সম্ভবনা থেকেই যায় ডিটেলবর্জিত এই ছবিটি সম্ভবত করাচীতে বসেই স্মৃতি থেকে আঁকেন শিল্পী, যখন তিনি চেতনায় অভাব বোধ করছেন বাংলার বসন্তকে এবং অবশ্যই পরিবারকে।
দুই
'প্রকৃতি' (মৎসকন্যা সিরিজ, ২০০৭) শিরোনামের ছবিটি নিয়ে সামান্য সংশয় ছিল বাংলাদেশের এইসময়কার প্রতিনিধিত্বকারী শিল্পী রোকেয়া সুলতানার মনে ... না ছবিটির সৃষ্টির সফলতা নিয়ে নয়, সংশয় ছিল দর্শকসাধারণের মধ্যবিত্ত মানসিক মনোবৃত্তি নিয়ে। রোকেয়া দিদিভায়ের অন্যান্য ছবিগুলির মতন এটিও বিমূর্ত নিসর্গের অন্তর্ভূক্ত, যার মধ্যে ছড়িয়ে আছে নারী-প্রকৃতি-আত্ম্নির্মাণের নির্যাস। বড়মাপের টেম্পারায় (৭২"/৩৬") কাজ নামানো যে কতটা কঠিন এবং দুঃসাধ্য তা একমাত্র ভুক্তভোগী শিল্পীমাত্রেই জানেন। ছবিটির ঠিক মধ্যেখানে মৎসকন্যার অবস্থান ... তাঁর কোমর-পরবর্তী অংশ ধীরে ধীরে পা থেকে মাছের লেজে পরিণত হচ্ছে। উপরের অংশে ইশারায় উর্বর স্তনদ্বয় ছাড়িয়ে হাত দুইখানি বৃক্ষ তথা প্রকৃতিতে রূপান্তরিত। ছবিটিতে প্রধান দুটি রঙ হল সামুদ্রিক নীল এবং প্রাকৃতিক সবুজ, ছড়ানো হয়েছে অনেকটা তরল রঙের অ্যাক্সিডেন্টাল কন্টোলিং পদ্ধতিতে। পদ্ধতির দিক থেকে এটি বেশ জটিল এবং অভিজ্ঞ শৈল্পিক কার্যকলাপের মধ্যে পড়ে। সেই সঙ্গে শিল্পী জুড়েছেন জমিনে ছাপচিত্রের নির্যাস, রেখা হয়েছে উদ্দীপনাময় অথচ মার্জিত এবং নিয়ন্ত্রিত। এইটুকু পাঠের পরেও কিন্তু পরিষ্কার হয় না মৎসকন্যার মনোবাসনা বা ছবিটির অন্তনিহিত বার্তা সম্পর্কে। এবার ছবিটির ঠিক উপরে মৎসকন্যার হাতের মুদ্রার দিকে নজর ফেলব ... দেখুন সে দুইহাত ভরে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে লালচে-কমলা পলাশকে। পলাশের গঠনও সামান্য আলাদা ... অনুমান করা যায় এটি শিল্পীর কলাভবন (শান্তিনিকেতন) এবং রাবীন্দ্রিক চিত্রকলা পাঠের অভিজ্ঞতা। এবার নিশ্চিত অনুভবে আসে পলাশচেতনায় ধীরে ধীরে মৎসকন্যার জীবনে আসছে প্রেমচেতনা সমৃদ্ধ বসন্তরাগ।
পলাশ মানবচেতনার নিয়ে আসে শাশ্বত প্রেম, উৎসবের মেজাজ আর রুক্ষ প্রকৃতি তথা জীবনে আনন্দের ছোঁয়া। বাঙালী হিসাবে তাই আমরা আশা করি যতদিন পলাশ থাকবে, ক্রিয়াশীল রইবে সৃষ্টিশীল মানবমন।
অমিত বিশ্বাস
কৃষ্ণনগর
তথ্যসূত্র :
১। Great Masters of Bangladesh : Zainul Abedin, Bengal Foundation.
২। জয়নুল আবেদিন : সৃষ্টিশীল জীবনসমগ্র, সৈয়দ আজিজুল হক
৩। শিল্পীপুত্র (কনিষ্ঠ) মইনুল আবেদিনের সঙ্গে আলাপচারী।
৪। শিল্পী রোকেয়া সুলতানার সঙ্গে আলাপচারী।

দারুণ আলোচনা, ছবিগুলোর বিশ্লেষণ খুবই ভালো লাগলো।
ReplyDelete