বাংলাদেশের শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন সাহেবের ১০৭তম জন্মবার্ষিকীতে ওনার 'কালবৈশাখী' শীর্ষক ছবির আলোচনা




শিল্পকলার নানা পথ আছে, পদ্ধতি আছে, প্রকরণ আছে। কিন্তু সে সবে পার্থক্য থাকলেও উদ্দেশ্য এক বলেই ফলটাও হবে অভিন্ন।

-শিল্পী জয়নুল আবেদিন 

 



ভারতের শিল্পগুরু অবনীন্দ্রনাথে সাথে কি বাংলাদেশের শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের কোনোদিন সাক্ষাৎ হয়েছিল ? কাগজে কলমে কিন্তু সেই কথার কোনো উল্লেখ নেই। কিন্তু 'কালবৈশাখী' শিরোনামে একটি কালি-তুলি এবং অপরটি জয়রঙে অঙ্কিত ১৯৫০ সালের ছবিদুটি দেখতে দেখতে মনে প্রশ্ন জাগে। কালি-তুলির ছবিটিতে দেখি পটজুড়ে  চওড়া চ্যাপ্টা তুলির আঁচড়ে অপ্রতিরোধ্য হাওয়াকে চিত্রিত করা হয়েছে। পটের এক কোণায় ঝড়ের বিপরীত দিয়ে ধাবমান দুটি চরিত্র। চিত্রপটের ঠিক উল্টোদিকে তাদের গন্তব্যস্থল সামান্য ইঙ্গিতে বর্তমান। এই ছবিটি সম্ভবত মূল ছবিটির বীজচিত্র। চিত্রপটের বামদিকে দেখি লাল ও আকাশী রঙের শাড়ি পরিহিতা দুই নারী অনেকটা ইংরাজি বর্ণমালার 'Z' চরিত্রের মত সুবিশাল ঝড়ের গতিমুখের বিপরীতে হাঁটবার চেষ্টা করছেন। শাড়ীর রঙ ও নগ্নপদ তাদের গ্রামীণ বঁধূর পরিচয় জ্ঞাপন করছে। আকাশী শাড়ী পরিহিতা রমণীর ডানকাঁখে ইঙ্গিতে একটি কালো রঙের কলসি বর্তমান। চিত্রপটের একদম শেষে আড়াআড়ি ভাবে একটি নীল-আঁচড় নদীর উপস্থিতি ব্যক্ত করে। সমস্ত সংকেতগুলি জুড়লে অনুভবে আসবে দুইজন গৃহবঁধূ দিনের শেষবেলায় জল নিয়ে বাড়ি ফিরবার সময় কালবৈশাখীর প্রকোপে পড়েছেন। বাংলাদেশের জীবনযাত্রায় গ্রীষ্মকালে এটি একটি অতি পরিচিত বিপদের চিত্রপট। ঘটনাটি জয়নুল আবেদিনের  'প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাপ্রসূত স্বভাবনিষ্ঠতা' ভঙ্গিতে অঙ্কিত। চিত্রপটের প্রায় পুরোটাই তিনি চওড়া-তুলির গাঢ় আঁচড়ে 'কালবৈশাখী'র প্রকোপ চিহ্নিত করেছেন। এই ঝড়ের মধ্যেও দুই গ্রামীণ বঁধুর জল নিয়ে বাড়ি ফেরার দৃশ্য অঙ্কনে ছবিটিতে একটি নতুন নান্দনিক মাত্রা জুড়ে দিয়েছে। চিত্রপটে রঙ নির্বাচন এবং অতিক্ষুদ্র গ্রামীণ বঁধুদের উপস্থাপনা শিল্পী অবনীন্দ্রনাথের কথা মনে পড়ায় অথচ রচনাকৌশল কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন। অর্থাৎ এই ছবিটি অবনীন্দ্রনাথ আঁকতেন ওয়াশ টেকনিকে আর জয়নুল এঁকেছিলেন স্বচ্ছ জলরঙে। মূল ছবিদুটি বাংলাদেশের জাতীয় জাদুঘরে জয়নুল সংগ্রহে রয়েছে, আগ্রহী দর্শককে অন্তত একবার সেখানে দর্শন করবার অনুরোধ জানালাম। 



বাংলাদেশের শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন সাহেবের ১০৭তম জন্মবার্ষিকীতে শ্রদ্ধেয় শিল্পীকে জানাই প্রণাম। 

Post a Comment

Previous Post Next Post