শান্তিনিকেতনের ম্যুরাল আন্দোলন / সৌমিক নন্দী মজুমদার


এই মাটির টান, প্রকৃতির নিবিড়তা উঠে এলো যেন বাড়ির আকাশে, যখন বিনোদবিহারী কলাভবন ছাত্রাবাসের বারান্দায় সিলিঙকে বেছে নিয়ে নির্সগ বিষয়ক একটি ম্যুরালের পরিকল্পনা করলেন ১৯৪০এ। নৈর্ব্যক্তিক প্রতিচ্ছবি নয়, ক্রমে আরো সবুজ, আরো গাঢ় হয়ে ওঠা প্রকৃতির শরীরী মেজাজ ছিল এই ম্যুরালটির সুর। বোধহয়, সবুজায়নের বৈভবে সম্পৃক্ত শান্তিনিকেতনের শেষ নিসর্গ-সংবেদ এই ম্যুরালটি। কারণ এই সময়ের পর থেকে বেশীর ভাগ ম্যুরালই রচিত হয় পৌরাণিক আড়ম্বর ও কাব্যিক আঙ্গিকে। কেবলমাত্র নিসর্গ নিয়েই তেমন কোনো ম্যুরাল আর হয় নি তখন। অনেক পরে যখন হলও বটে, সেই নিসর্গ নিজেই তখন ভূমিচ্যুত, প্রায় উন্মুল। বীরভুমের বিখ্যাত প্রকৃতিও তখন অতীতাচারিতা ও স্বপ্নময় বিলাপের বিষয়। কিন্তু সেই স্বপ্নের প্রেক্ষাপটের রঙ কালো। কারণ, শান্তিনিকেতনের সেই প্রকৃতিও আমাদের নির্বিচার আগ্রাসনে পরাক্রান্ত। অন্ধকারে আলো দিয়ে কুঁদে তোলা অথবা নেগেটিভ্‌ ফিল্মের মতো কালোর ওপর সাদায়, তাই প্রেতাত্মার মতো প্রকৃতির স্মৃতি উঠে আসে সুব্রক্ষ্ণণ্যমের সাদা-কালো ম্যুরালটিতে। ১৯৯০ এবং ১৯৯৩ সালে, দুই পর্যায়ে করা কলাভবনের ডিজাইন বিভাগের বাড়ির চারদিকে আদ্যোপান্ত মুড়ে আঁকা এই ম্যুরালটি, মেদুরতার পরিবর্তে আনে আশঙ্কার ছায়া। সাদা-কালো বিন্যাস ও বিভিন্ন রূপাকৃতি অবস্থান ও গতির ব্যঞ্জনায়, বাড়িটার সাদামাটা আকারও রূপান্তরিত হয়ে যায়। ধ্বস্ব প্রকৃতির স্মৃতি নিপুণ ক্যালিগ্রাফির ছন্দে আপন লীলায় মেতে ওঠে আমাদেরই অহংবোধের শরীরে। পরবর্তীকালে, ২০০৯-১০এ, সুব্রক্ষ্ণণ্যম, ওই একই বাড়ির, একই দেয়ালে, আগের ছবিটিকে সম্পূর্ণ উঠিয়ে ফেলে, নতুন করে আরেকটি ছবি আঁকেন, সেই সাদা-কালোয়। প্রাকৃতিক, পৌরাণিক অনুষঙ্গের পাশাপাশি, বর্তমান রচনায় শিল্পী অর্ন্তভুক্ত করে নেন আজকের কলাভবনের রকমারি চরিত্র, ছাত্রী-ছাত্র, মায় ফোটোগ্রাফারের দল। নির্সগ এখানে আর গা ছমছম করা প্রেতাত্মাও নয়। পুরাণকল্প কেবল ঐতিহ্যের সুরবাহক নয়, প্রবলভাবে সমসাময়িকের প্রতীক হয়ে উঠে আসছে। চিত্রকল্পের এই অভিনব সমাবেশ দেয়ালে সাঁটা পোস্টারের মতো তীব্র, তাৎক্ষণিক অথচ বর্তমান কালের অর্ধচেতনে তার নিঃশ্বাস। শান্তিনিকেতনের আজকের সংকট টের পাওয়া যায় এই নিঃশ্বাসে।

শান্তিনিকেতনের ম্যুরাল আন্দোলন / সৌমিক নন্দী মজুমদার

Post a Comment

Previous Post Next Post