সমালোচক বিচারক নন, একজন নিবিষ্ট দর্শক মাত্র / মৃণাল ঘোষ (সাক্ষাৎকার)
(১) সমালোচনার জগতে কিভাবে এলেন ?
একেবারেই কাকতালীয়ভাবে। লেখক হওয়ার পরিকল্পনা ১৯৮০ পর্যন্ত আমার স্বপ্নেও ছিল না। তবে শিল্পকলার প্রতি অপরিসীম আগ্রহ ও জানার ইচ্ছা ছিল তার অনেক আগে থেকে। সমকালীন শিল্প সম্পর্কে কিছু প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে একটা প্রবন্ধ লিখেছিলাম। এক বন্ধুর প্ররোচনায় সেটা 'পরিচয়' পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল ১৯৮২ সালে। তারপর থেকে আর থামার সুযোগ পাইনি।
(২) শিল্পসমালোচকের সামাজিক ও আত্মদায় বলতে কি বোঝেন আপনি ?
আত্মদায়ই সামাজিক দায়। নিজের জানাকে সম্পূর্ণ করার জন্য লেখা। সেটাই আত্মদায়। জানার চেষ্টাটা একটা সামাজিক অবস্থান ও সমাজ-দর্শন থেকে। সমাজদর্শন আর জীবনদর্শন সমার্থক। একটি কোনো নৈতিক ভিত্তি না থাকলে লেখার অর্থ হয় না। সেই নৈতিক ভিত্তি সামাজিক দায় থেকে উঠে আসে।
(৪) আপনার শৈশবের ঘটনা যা আপনাকে অনুপ্রাণিত করেছে সে সম্পর্কে কিছু বলুন।
আমার শৈশবের প্রথম স্মৃতি একটি বিরাট নদীর সামনে দাঁড়ানোর স্মৃতি। মেঘনা নদী, তার
পরের স্মৃতি হিন্দু-মুলসমান সাম্প্রদায়িক সংঘাতের। সুন্দর আর অসুন্দর, আলো ও অন্ধকারের এই সংঘাত সারা জীবন ধরে সমস্ত ভাবনা ও কাজকে প্রভাবিত করেছে।
(৬) প্রত্যেক সফল মানুষের একটি নিভৃত প্রস্তুতিপর্ব থাকে, আমরা 'সমালোচক মৃণাল ঘোষ' এর প্রস্তুতিপর্ব জানতে আগ্রহী।
প্রতিটি মুহূর্তই মানুষের প্রস্তুতিপর্ব। প্রস্তুতি প্রতিনিয়ত চলতে থাকে। সেই শৈশব থেকে শুরু
দেখা আর পড়াশোনা। সেটা চলছে আজও। আর আছে অতৃপ্তি। না জানার পাহাড় প্রমাণ ভার।
(১০) ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় দেখেছি অধিকাংশ মানুষ এবং শিল্পীরাও বিরূপ সমালোচনা সহ্য করতে পারেন না। এ সম্পর্কে আপনার অভিমত জানান।
বিরূপ সমালোচনা যদি সমালোচকের আত্মম্ভ্ররিতা প্রসূত না হয়, তা যদি গঠনমূলক ও বিনীত হয়, তাহলে কোনও সমস্যা হয় না। সমালোচক বিচারক নন। একজন নিবিষ্ট দর্শক মাত্র। এই বদান্যতা থেকে তাঁর অতৃপ্তি কানালে কেউ অসন্তুষ্ট হন বলে মনে হয় না। কিন্তু সমালোচকের ক্ষমতার দর্প অনেক সময়ই শিল্পের ক্ষতি করে।
(১৩) শিল্প সৃষ্টির লক্ষ্য ও উদ্দেশ কী হয়া উচিত বলে আপনার মনে হয় ?
শিল্প সৃষ্টির লক্ষ্য মানুষের চৈতন্যের যে সীমাবদ্ধতা, তাকে পূর্ণতার দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রয়াস। পূর্ণতার কোনো শেষ নেই। তাকে কখনও ছোঁয়া যায় না। তবু সেই অভিমুখে ক্রমাগত না চললে জীবন স্থানু হয়ে যায়। যে কোনো সৃজনমূলক কাজের মধ্য দিয়েই মানুষ আত্মবিশ্লেষণ করে। তা থেকে উঠে আসে আনন্দ ও আনন্দজারিত বেদনা।
(৩০) বাংলা সমালোচনার ভবিষ্যত সম্পর্কে আপনার অভিমত বলুন।
বাংলা সমালোচনার কোনো ভবিষ্যত নেই। বিশ্বায়নের দাপটে ইংরাজির বাড়বাড়ন্ত। বাংলাভাষা এই বাংলায় অন্তত একেবারেই প্রান্তিক। বই ছাপার জন্য ভালো কোনো প্রকাশক পাওয়াও কষ্টকর। বাংলা সমালোচনার যে সমৃদ্ধ ধারাবাহিকতা গড়ে উঠেছিল বিংশ শতকে ক্রমশই সংকুচিত হয়ে আসছে।
