প্রথম থেকেই নিজের ছবি নিয়ে দ্বিধায় বিচলিত ছিলেন কবি। 'যখন আর কিছু ভালো লাগে না' তখন ছবি আঁকতেন। একটা বড় অবলম্বন একদিন তাঁকেই জাপটে ধরে। সময়ের ফাঁকে 'কিশলয় উদগমের' যে ছবি তিনি আঁকতেন, তাকেই পরিচর্চার জন্য ব্যাকুল হয়ে গেলেন কবি। 'ভারী নেশা' ধরিয়ে দিল তাঁকে। ছবি আঁকা তাঁকে পেয়ে বসল। ১৯২৬-৩০ এই সময়ের মধ্যে অভাবনীয় দ্রুততার সঙ্গে তিনি এঁকে চললেন। ছবি আঁকার জন্য তাঁর খুব চটকদার আধারের প্রয়োজন হতো না। আধার ও আঙ্গিক স্বভাবতই তাঁর প্রতিভানুগ ও বিশিষ্ট। প্রায় সব ছবিই তাই জল রং-এ আঁকা। আবার কিছু ছবি কালি-কলমের, পেনসিলের বা শুকনো রং-এরও। তেল রং-এর ছবি আঁকার মতন সময় বা ধৈর্য তাঁর ছিল না। তাই তেল রং-এ আঁকার চেষ্টা থেকে বিরত থেকেছেন। যাতে রং তাড়াতাড়ি শুকিয়ে যায়, তার জন্য অনেক সময় তিনি রং-এ স্পিরিটও মিশিয়ে নিতেন। আঁকবার জন্য তুলির ব্যবহার করতেন মাঝে মাঝে, সঙ্গত করত তুলো,ন্যাকড়া,ফাউন্টেন পেন, কলমের উল্টো দিক। এই ছিল তাঁর আঁকার উপকরণ। শোনা যায়, অনেক সময় ছবি আঁকার দ্রুততার হাতিয়ার যদি নষ্ট হয়ে যেত বা ভেঙ্গে যেত তবে সেই ভাঙ্গা হাতিয়ার দিয়েই ছবি শেষ করতেন। তাঁর প্রবল সৃষ্টি প্রেরণা কখনই বাধা মানত না। কবির মনের ফাঁকে ফাঁকে একটি চিত্রশিল্পীর বিভাব ছিলো খুব যথাযথভাবে। তাঁর কাব্য নীতির মাঝে-মাঝে রেখাময়ী রূপের ঘনঘটা আমাদের সকলের জানা। তাঁর পান্ডুলিপির খাতায় যখন কবিতার খারিজ করা পংক্তিগুলিকে কেটে দেওয়ার প্রয়োজন হতো তখন কবি সেই কঠোর হাতের দাগ কাটা রেখাগুলি দেখে পীড়া বোধ করতেন। তাঁর মনে হত 'রূপরাজ্যের অনুভূতির পথে এই চাবুকের মতন রেখাগুলি নিতান্তই অশোভন অত্যাচার'। আর সে কারণেই বোধকরি অসীম মমতার সেগুলিকে অন্য একটি ভাষায় প্রকাশ করলেন কবিতার মাঝখানে রেখা-চিত্র। ঘটে চলল নানান বিচিত্র রূপগর্ভ নক্সার আবির্ভাব। পান্ডুলিপির খাতায় এইসব নক্সাগুলিও তাঁর চিত্ররচনার অন্যতম প্রেরণা।
রঙ ও রবীন্দ্রনাথ / সুশান্ত দাস
রঙ ও রবীন্দ্রনাথ / সুশান্ত দাস
