চিত্রকরের স্বীকারোক্তি - ১

চিত্রকরের স্বীকারোক্তি - ১
অমিত বিশ্বাস

ম্যাগাজিন (জীবনকুচি, বিশেষ শিল্পকলা সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০০৯) তৈরি করার সময় একটি বিষয় রাখা হয়েছিল "শিল্পীর শিল্পভাবনা"। অনেকেই নিজের শিল্পভাবনার লিখিত রূপ দিতে পারবেন না জানান। তাদের জন্য তৈরি করা হয় তিপ্পান্নটি প্রশ্ন। শিল্পীকে চতুর্মাত্রিক জানার জন্যই পরিকল্পিতভাবে এই প্রশ্নাবলীর সৃষ্টি। যেহেতু প্রশ্নকর্তা আমিই (হেতু অতিথি সম্পাদক), আমার দায় জন্মায় উত্তরগুলি জানানো অর্থাৎ নিজেকে চতুর্মাত্রিকভাবে জানানো।

ছোটবেলায় পাড়ায় একটি তিনতলা স্কুলবাড়ি ছিলো, যেখানে বড় বড় দিদিরা পড়তো। এলাকায় সেটি ছিলো সবচেয়ে উঁচু বাড়ি এবং সে বাড়িতে কতগুলি নিষিদ্ধ স্থান ছিলো যেখানে যাবার অধিকার ছিলো না। আমার কাজ ছিলো দিবা স্বপ্নে সেই স্কুলবাড়িটি আকাশে ওড়ানো। ঐ বাড়ির বারান্দায় একটি চেয়ার ছিলো আমার সিংহাসন। ছিলো বেশ কিছু অনুগামী প্রজাও। সম্ভবত এটিই আমার প্রথম শিল্পকর্ম।

বাড়িতে পড়াতে আসতেন একজন শিক্ষক। ছবি আঁকার হাত তাঁর যথেষ্ট ভালো, আমার প্রথম শিক্ষাগুরু। আমার কল্পনাকে অদ্ভুতভাবে উস্‌কে দিতেন। দৃঢ়ভাবে এখনো বিশ্বাস করেন আমি বিশেষ কিছু করবো। ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ার সময় ভর্তি হই স্থানীয় চিত্র-শিক্ষকের কাছে। দীর্ঘ বারো বছর ছিলাম তাঁর কাছে। ছবি আঁকতাম কিন্তু সমালোচনা করতাম বোধহয় বেশি। মনে পড়ে স্কুলের ক্লাসে এক বন্ধুর আঁকা দেখে বলেছিলাম "জানিস আমাদের স্যার তোর ছবি থেকে অনেক ভুল বের করতে পারবেন।" ছেলেটি বিরক্ত হয়ে ছবিটি ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখে। বহু পড়ে বুঝেছিলাম ভুল ধরা শিক্ষকের নয় নিন্দুকের কাজ, ছবিকে উন্নত করাই তাঁর কাজ। তিনিই যোগাবেন অনুপ্রেরণা, সাহস, জাগ্রত করাবেন আত্মবিশ্বাসকে।

আঁকা স্কুলের (তখন একাদশ শ্রেণীর ছাত্র) এক সিনিয়র সতীর্থ একদিন তাদের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে দেখালো পাশ্চাত্যের শ্রেষ্ঠ শিল্পকলার অনুলিপি। বোঝালো কিভাবে একটি ফিগারকে স্কেচ করতে হয়। চোখের সামনে নতুন দিগন্ত খুলে গেলো। বিরোধ বাঁধলো শিক্ষকের সঙ্গে। ঠান্ডা ছেলে, তাই লাঠালাঠি বা মুখোমুখিও নয়, বুঝলাম নিজেকেই করে দেখাতে হবে। কিন্তু কীভাবে জানতাম না। শহরের বড় মাস্টারদের কাছে যাওয়া যাবে না, পাত্তা দেবে না। বয়সও হয়েছে, ছবি এতটুকু এগোয়নি অর্থাৎ ষষ্ঠ শ্রেণীতে পরার সময় যা ছিল তাই আছে। সাহায্য করলেন নদীয়া জেলা গ্রন্থাগারের এক কর্মীকাকু (শ্রী জনার্দন সাহা)। তিনি রেফারেন্স রুমের শিল্পকলার বিশাল বই ভান্ডার আমার সামনে খুলে দিলেন। পাগলের মতো, হ্যাঁ ঠিক পাগলের মতো ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম।

স্রোতস্বিনী নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়লে প্রথমে হাবুডুবু খেতে হয় যদিও গন্তব্যস্থল একই থাকে, আমারো সেই অবস্থা হলো। দেশী বিদেশী ভালো খারাপ প্রচুর ছবি ও লেখা পেলাম শিল্পকলা সম্পর্কে। সময় নিলো গা সওয়া হতে। আস্তে আস্তে প্রবেশ করলাম শিল্পের অন্দরমহলে। বুদ্ধি দিয়ে বিচার বিশ্লেষণ করে ঠিক করে নিলাম কোন কাজগুলি ভালো কাজ। ছেলেবেলা থেকে আমি কোনো কাজ অনুকরণ করতে পারতাম না, এমনকি নিজের কোনো দুটি কাজ একই রকম হয় না। ফলে বেশ কয়েকটি ছবি আঁকলাম। কিছু কাজ দাঁড়ালো না, গলে পড়লো। মনে প্রশ্ন উঠলো কেন ওই কাজগুলি গলে পড়লো। 

জীবনে আমি যতবার আটকে পড়েছি ততবারই ঠিক কেউ না কেউ এসে আমার পাশে দাঁড়িয়েছেন। গলেপড়া ছবি নিয়ে অনুসন্ধান পর্বে পাশে পেলাম প্রণবদা (ফৌজদার)কে। উনি নিজের কাজ সামনে রেখে বোঝালেন কীভাবে শক্তিশালী কম্পোজিশান তৈরি করা যায়। দেখালেন ছবিতে আকার ও শূন্যস্থান কীভাবে নিক্তিতে পামতে হয়। একইভাবে রঙের জগত চিনিয়েছেন বর্ষীয়ান শিল্পী ব্রজেন্দ্রনারায়ণ জেঠু(দত্ত)। জটিল দর্শন সহজভাবে বুঝিয়েছেন ডঃ নীরদবরণ জেঠু (হাজরা)।

শুরু হলো কাটাছেঁড়া পর্ব। পূর্ববর্তী যেসব শিল্পীদের কাজ আমার ভালো লাগে বুঝতে পারি, অথবা না পারি তাঁদের কাজ ব্যবচ্ছেদ করেই নিজেকে সমৃদ্ধ করলাম। বলাবাহুল্য নিকৃষ্ট কাজ গেল ডাস্টবিনে। ভালোলাগা শিল্পী গণেশ পাইনের কাজ চলে এলো ব্যবচ্ছেদ টেবিলে। কারণ ইনি অন্যতম শিল্পী যাঁর বেশির ভাগ কাজই ভালো এবং তা থেকে অনেক কিছু শেখা যায়। এছাড়া, কোথাও যেন মনের টান, চোখের সুর - মনে হলে একটা আশ্রয় পাচ্ছে। একে সমমানসিকতা বললে কি ধৃষ্টতা হবে ? ফলে ওনাকে এবং ওনার কাজকে পড়ে ফেলা যায়।

আমার ছবিতে ধারণাটি আসে আবেগ অর্থাৎ মনের অবচেতন স্তর থেকে। বুদ্ধি দিয়ে ক্যানভাসে বন্দী করি তাকে, ওখানে আবেগের প্রবেশ নিষিদ্ধ। ভাবনাকে প্রায় পুরোপুরি চিত্ররূপ দেওয়াকে আমি সাফল্য হিসাবে ধরি। কোনো বিশেষ ধরণের প্রতীক/মোটিফ আমি ব্যবহার করি না। ভূমিজ রঙকে ধুয়ে আঠা মিশিয়ে হাতে তৈরী (handmade) কাগজে টেম্পারায় কাজ করি। প্রয়োজন অনুসারে বিভিন্ন ধরণের টেক্সচার তুলি দিয়ে তৈরি করি ছবির বুকে। স্বভাবতঃ ছবি শেষ হতে অনেক সময় নেয়। কঠিন মাধ্যম নিয়ে কাজ করার মধ্যে একধরণের চ্যালেঞ্জ অনুভব করা যায়। ছবিই ঠিক করে দেয় কোন মাধ্যমে সে প্রকাশ হবে। বিকল্প মাধ্যম হিসাবে প্রচুর কালি কলমে কাজ করি। সাদা ও কালো রঙ আমার প্রিয় রঙ। অন্যান্য রঙকে রঙের চরিত্র ও আবেদন অনুসারে ব্যবহার করি। খুব তাড়াতাড়ি রঙিন ছবি করতে হলে কাগজ কেটে কোলাজ করি।

আমি মনে করি ছতে মনস্তত্ত্বের গুরুত্ব অপরিসীম। প্রতি মুহূর্তে নিজেকে ছেঁড়াকাটা করি। যাবতীয় দেখা না দেখা ঘটনা ধৈর্য্য সহকারে বিচার বিশ্লেষণ করে কোনো কিছু গ্রহণ করাটাই আমার আদর্শ। আমার প্রত্যেকটি কাজই আমার আত্মপ্রতিকৃতি। ছবি আমাকে বলে দেয় কখন আমি ছবি থেকে তুলি তুলে নেবো। অনেক সময় মনঃসংযোগ করতে পারি না বলে ছবি বরবাদ হয়ে যায়। তখন নিঃসঙ্গতা অনুভব করি ভীষণ ভাবে। মাঝে মাঝে এমন একটি সময় আসে যখন মাথা দিয়ে কিছুই বেরোয় না তখন সাময়িক জড়ভরত হয়ে যাই। ব্যক্তি মনের খোঁজার চিহ্নগুলিই শিল্পকর্ম। বিশ্বাস করি একদিন চরম লক্ষ্যে পৌঁছাবই। সেই খোঁজায় ফাঁকি থাকে না, কারণ "সৌখিন মজদুরি" আমার আসে না।

প্রত্যেকটি মাধ্যমই (যেমন চলচ্চিত্র, কবিতা, পারফর্মিং আর্ট, সঙ্গীত,নাটক ইত্যাদি) শিল্পের আঁতুরঘর, শুধুমাত্র উপযুক্ত ব্যক্তির হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। সেই কারণেই অন্য সব ধরণের শিল্পমাধ্যম আমার চিন্তার রসদ যোগায়। একইভাবে শিল্প-কর্মশালায় আমরা পারস্পরিক জ্ঞান, টেকনিক এবং দর্শন আদান-প্রদান করি।

নিরপেক্ষ শিল্পালোচনায় অপর শিল্পীর ভালো কাজ থেকে নিজেকে শিক্ষিত করা যায় আর সেই সঙ্গে নিজের কাজের দূর্বল দিককে শক্তিশালী করতে সাহায্য করে। আমার সৌভাগ্য এই বাংলায় আমি বেশ কয়েকজন শক্তিশালী সমালোচকের দেখা পেয়েছি যারা আমায় সমৃদ্ধ করেছেন। একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা এখানে শেয়ার করি। সমালোচকদের মধ্যে অন্যতম হলেন মৃণাল ঘোষ। তাঁর লেখা 'গণেশ পাইনের ছবি' প্রথম সংস্করণ ছিল শিল্প-বিষয়ক প্রথম সিরিয়াস বহু-পঠিত বই।। এই বই পড়েই গণেশ পাইনের সঙ্গে আমার পরিচয় নিবিড়তর হয়েছে। যখন ওনার আঁকা 'বেহুলা (১৯৯৯)' দেখলাম - বিষয়ঃ স্বামীর প্রাণ ফিরিয়ে আনা - এ ছবিতে যে লাল রঙ, আর সেই রঙ বেয়ে এগোনো যে প্যাশান তা অবাক করলো। কারণ এর আগে তাঁর যা ছবি দেখেছি, সেখানে তো এই রঙ বা এই ভাব ছিলো না। মনে অনুভূত হলো যে গণেশ পাইন বিবাহিত। বন্ধুদের বললাম, তারা হেসে উড়িয়ে দিল। পরে ওই বইয়ের দ্বিতীয় সংস্করণ পড়ে জানলাম গণেশ পাইন আর অবিবাহিত নন। তাহলে কি এই ভাবেই ভাবতে হয় চিত্রপট ? এতটা নিষ্ঠায় তিনি দেখেছেন - বুঝেছেন ! বুঝলাম এখানেই আলোচকের গুরুত্ব।

সর্বদা মনে রাখি শিল্পকলা কোনো প্রোডাক্ট নয় যে বাজারের চাহিদা অনুযায়ী বাড়বে বা কমবে। তাতে ওর গুণগত মানের অবনতি হয়। বাজার অবশ্যই শিল্পকর্ম ও শিল্পীর জনপ্রিয়তা বাড়াতে সাহায্য করে। শিল্পীর জনপ্রিয়তা অনেক সময় তাঁর কাজের অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। তবে শিল্পকর্মের জনপ্রিয়তার প্রয়োজন আছে। জনপ্রিয় শিল্পকর্মের দর্শন/বোধ অন্য ব্যক্তিকে প্রভাবিত ও অনুপ্রাণিত করে।

সুস্থ ব্যক্তিত্ব ব্যক্তিকে তাঁর নিজের কাজ সুচারু ভাবে সমাপ্ত করতে সাহায্য করে। এই ব্যক্তিরাই আমার শিক্ষাগুরু, এরাই আমার কাজের দর্শক। এরা না থাকলে আমাকে হিমালয়ের নির্জনে বাসা বাঁধতে হতো। অভিজ্ঞতা দিয়ে দেখেছি প্রত্যেকটি মানুষের মধ্যে কোনো না কোনো শিল্পবোধ আছে। সেটাকে উৎসাহিত (Promote) করার চেষ্টা করি। প্রবাদ আছে গর্ভবতীকে যদি ভালো ভালো খাবার দেওয়া যায়, তবে আশা করা যায় যে সে সুস্থ সন্তানের জন্ম দেবে। একই কথা শিল্পীদের বেলায় যেমন সত্য, দর্শকের বেলাতেও সমানভাবে সত্য। দায়টা তো দুপক্ষেরই। সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নে আমি মনে করি সমাজকে টিকিয়ে রাখতে গেলে সমাজবদ্ধ মানুষকে শ্রম দিতে হয়, মান্য করতে হয়, উত্তরণ করতে হয়। শিল্পীতো সমাজের বাইরে নয়। প্রসঙ্গত জানিয়ে রাখি সামাজিক জীব হিসাবে আমি সেন্ট জন্স অ্যাম্বুলেন্স অ্যাসোসিয়েশন নামক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের দায়িত্ববান আজীবন সদস্য।

কতোগুলি ভালো "না" হলো - শিল্পী না হলে বাবা-মার ভালো ছেলে হতাম। কাজ করবো না তাও ভালো কিন্তু নিন্মমানের কাজ কখনও করি না। জাগতিক/সাংসারিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য মিথ্যা বলি না। আত্মা-অনুসন্ধানের প্রথম পর্যায়ে আছি, তাই শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্ম এখনো সৃষ্টি সম্ভব হয় নি। পরজন্ম মানি না, থাকলে শিল্পীই হতাম। এখনো পর্যন্ত 'শিল্পের জন্য শিল্প' কথাটি মানি না। আর্থিক সাফল্যই এগিয়ে যাওয়ার একমাত্র মাপকাঠি বলে মনে করি না। ভবিষ্যত বলা সম্ভব নয় কিন্তু শিল্পকলা বেছে নিয়েছি বলে এখনো আক্ষেপ হয় না, এখনো পর্যন্ত মৃত্যুশোক তেমন পাই নি যা শিল্পকে প্রভাবিত করবে।

গণেশ পাইন একটি চিঠির উত্তরে বলেছিলেন নগরজীবনের প্যাটার্ন, বাড়িঘর, নিত্য ব্যবহার্য সামগ্রীর আকার ও রঙ সবদেশেই এখন একরকম। এইসব উপকরণ নিয়ত চোখের উপর দেখতে দেখতে যে সব Composition সম্ভব হয় তা ইউরোপ আমেরিকার চেয়ে ভিন্ন নয়। Shape এবং Colour এর অভিজ্ঞতা ফলে নির্বিশেষ হয়ে পড়ে, আধুনিক/উত্তর-আধুনিক শিল্পকলার সমস্যা এই। সমাধান হিসাবে বলেছেন আমাদের দায় এই আন্ত্ররজাতিক বাস্তবকে, আধুনিকতাকে স্বতন্ত্র এক শিল্প ভাষায় ব্যক্ত করা ... কিন্তু কীভাবে ?

খেজুর গাছের বীজ আরবের মরুভূমিতে বপন করলে তার আকার হবে রুক্ষ, ফল হবে শুকনো। সেই বীজ বাংলায় লাগালে গাছ হবে মোটা মোটা, পাতা হবে ঘন সবুজ আর ফল হবে রসালো। দুটিই নান্দনিক ভাবে সত্য। একই ভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ঐ একইরকম বীজ বপন করলে তাদেরও নান্দনিক আবেদন হবে ভিন্ন। আবার কিছু দেশে প্রতিকূল পরিবেশে গাছ জন্মাবেই না। এখান থেকে পাচ্ছি যে বীজ একই রকমের হলেও মাটি বা পরিবেশের গুণে গাছের আবেদন হয় ভিন্ন ভিন্ন, আবার কিছু স্থানে সেই গাছ জন্মালো একেবারেই অসম্ভব। সেই স্থানে কৃত্রিমভাবে অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে গাছ জন্মানো সম্ভব হলে তার ফলের স্বাদ কৃত্রিম বা মেকি হতে বাধ্য।

ছবির ভাষাতে বলি, বিদেশের ডাডা আন্দোলনের যৌক্তিকতা এ বাংলায় প্রয়োজন নেই কিন্তু সুররিয়েলিজম্‌-এর (পরাবাস্তববাদ) প্রয়োজন আছে। বিষ্ণুপুরাণের নরক বর্ণনাও তো মনের অবচেতনের ছায়া অথবা স্বর্গও। যামিনী রায়,জয়নুল আবেদিন, ধর্মনারায়ণ দাশগুপ্ত, কামরুল হাসান, চিন্তামণি কর, বিপিন গোস্বামী, রামকিংকর, পরিতোষ সেন, সুনীলমাধব সেন, প্রকাশ কর্মকার, সত্যেন ঘোষাল, সুলতান, গণেশ পাইন ভীষণভাবে আধুনিক হয়েও বাংলার মাটির গুণে অনন্য। যেমনভাবে শাগালের ছবিতে রাশিয়ান গ্রাম, পিকাসো ও দালিতে স্প্যানিশ ফ্লেবার পাওয়া যায়। আমরা স্বাস্থ্যবান শিবকে ভুড়িওয়ালা গাঁজাসেবক বাড়ির কর্তা বানিয়েছি, দূর্গাকে মা, কৃষ্ণকে ঘরের ছোটো ছেলে ... উদাহরণ বাড়াবো না।

কোরিয়া, জাপান, চীন, বাংলাদেশ, মায়ান্মার, আফগানিস্থান ইত্যাদি দেশের আর্ট অথবা কমার্শিয়াল সিনেমাতে দেখা যায় তারা তাদের দেশের মাটির গন্ধ অর্থাৎ উৎসব, আচার, দর্শন, খাদ্য ইত্যাদি তুলে ধরে। তারা যদি অন্য কোনো দেশে বসবাস করতে বাধ্য হয় তখনও দেখা যায় তাদের বাড়ির ইনটেরিয়র দেশের ঐতিহ্য অনুসারী অথচ সর্বাধুনিক রূপে। একটু বেশি দৈহিক ও মানসিক পরিশ্রম করলে আমরাও এটা পারি। ছবি, ভাস্কর্যে অনেকেই এটি করেছেন (উপরক্ত শিল্পীসহ)। নিজের জননীকে প্রদক্ষিণ করে গণেশ যদি তাঁর বিশ্বভ্রমণ সম্পূর্ণ করতে পারেন, আমরাও পারব। বিদেশ থেকে রাজহাঁসের মতো জলমেশানো দুধ থেকে শুধু দুধটুকু নেবো। বাকিটা এই মাটির গুণে ভালো শিল্পকর্ম সৃষ্টি হতে সাহায্য করবে। আমাদের ঐতিহ্যকে বুঝে নিয়ে তাকে পূজার বেদীতে না বসিয়ে তাকে যদি আরোও উত্তরণ ঘটাতে পারি তবে আগামীদিনে বলতে পারবো যে আমরা উত্তর আধুনিক জগতে প্রবেশ করেছি। সেই দিনটিই হবে আমার জীবনের সবথেকে আনন্দের দিন।
(পরিমার্জিত)



















1 Comments

  1. শৈশব থেকেই মানুষ অনুকরন প্রিও হয়।
    যা দেখে তাই শেখে,
    কিন্তু বয়স বারার সাথে সাথে,
    কিছু মানুষ নিজের বোধে সম্পৃক্ত হতে থাকে,
    তারা নতুন মনে নতুন চখে নতুন ভাবে
    এই সমাজটা কে দেখবার চেষ্টা করে।
    কারোর হাত ধরে নয়,
    নিজের পায়ে সম্পূর্ণ এক নতুন যাত্রী
    অজানা পথের দিকে এগিয়ে যায়।
    পরবর্তী কালে সেটাই সাধারন মানুষের
    জীবনের পথ হয়ে ওঠে।

    ReplyDelete
Previous Post Next Post