সুনীল দাশ : এক অদম্য আর বিতর্কিত রেখাচিত্র
কলম আর সরছিল না, অনেকবার ভেবেছি লিখব কি লিখব না ...
'ঘোড়া সুনীল' এই নামে বেশি জনপ্রিয় ছিলেন তিনি, শোনা যায় নামটি স্বয়ং রামকিংকরের দেওয়া। আত্মজীবনীতে লিখেছেন টেলিফোন তুলে নিজে ঘোষণা করতেন 'ঘোড়া দাস' বলছি !!! বিতর্ক সারাজীবন পিছু নিলেও মৃত্যুর খবর সোশ্যাল নেটওয়ার্কে পোষ্ট হতেই ভাইরাল হয়ে যায় এতটাই যার জনপ্রিয়তা। সর্বদা থেকেছেন বন্ধু-বান্ধর পরিবৃত হয়েও (হ্যাঁ অবশ্যই অনেক সময় পরিষদবর্গ চামচ সহ)। আসলে কয়েক বছর আগে প্রথম দর্শনটি মোটেই সুখকর হয় নি, অথচ যা হওয়াই স্বাভাবিক ছিল এই বাংলার অন্যতম চিত্রী ও ভাস্কর সুনীশ দাশের সম্পর্কে।
"It's a fake"
আচমকা এই চিৎকার আর ফ্ল্যাশবাল্বের ঝলকানিতে প্রথম চাক্ষুষ দর্শন হয়েছিল এইসময়ের বর্যীয়ান শিল্পী সুনীল দাশের সঙ্গে ICCR গ্যালারী, কলিকাতায় । নিজের আঁকা তিরিশলাখি ছবিটিকে মুহূর্তের মধ্যে খারিজ করে দিলেন শিল্পী, যেটি প্রধান আকর্ষণ হিসাবে ঝোলানো ছিল এই প্রদর্শনীকক্ষেই। এই ধরণের নাটকীয়তার দেখতে আমরা অভ্যস্ত নই। আর উনি নির্বিকারে পরের কর্মসূচীতে মনোনিবেশ করলেন !!!
না, শুরুটা মোটেই এইরকম ছিলো না ...
সুনীল দাশ জন্মগ্রহণ করেন ১৯৩৯ সালের আগষ্ট মাসের ৪ তারিখে পিতামাতার পঞ্চম সন্তান হিসাবে, কলিকাতার কালিঘাট অঞ্চলে। শিল্পকলার প্রতি ঝোঁক সেই ছোটবেলা থেকে যা সমৃদ্ধ হয়েছিল সিনেমার ব্যানার আঁকিয়েদের কাজ এবং কালিঘাটের মন্দির পার্শ্ববতী দোকানে ঝোলানো পট দেখতে দেখতে। ছোট ব্যবসায়ী পরিবারের শিল্পকলাপ্রেমী কোনো ধারাবাহিক ইতিহাস না থাকা সত্ত্বেও পড়াশুনা শেষ করে প্রথমে ইন্ডিয়ার স্কুল এবং পরে গভর্মেন্ট কলেজে ভর্তি হন তিনি, সরাসরি দ্বিতীয় বর্ষে। কারণ একটাই ... ড্রইং-এর হাত খুব ভালো। কলেজের চতুর্থবর্ষের ছাত্র থাকাকালীন ১৯৫৯ সালে ললিতকলা একাদেমির জাতীয় পুরস্কার পান ঘোড়ার ড্রইং এর জন্য এবং একই বছর একাদেমির বার্ষিক প্রদর্শনীতে কাজ দেখে এক আমেরিকান তাঁর সাতটি ড্রইং সংগ্রহ করেন সাতশো টাকায় ...এটা সেই সময় বলা যেতে পারে ভারতীয় শিল্পমহলের নজিরবিহীন ঘটনা।
মাষ্টারমহাশয়দের কাছে শুনেছিলেন যত অ্যানিমেল ড্রইং করা যায় তত হাত খোলে। তাই ছাত্রাবস্থায় নিয়মিত রেসের মাঠ এবং পুলিশ আস্তাবলই হয়ে ওঠে সুনীল দাশের দ্বিতীয় আস্তানা। এই সময়ের একটি গল্প শিল্পীমহলে শোনা যায়। জাতীয় পুরস্কার পাওয়ার অর্থ দিয়ে শিল্পী একটিন বিস্কুট সংগ্রহ করে পুলিশের আস্তাবলে পৌঁছায় এবং নিজের হাতে সব ঘোড়াকে খাওয়ান। বন্ধুরা প্রশ্ন করলে নির্বিকারে জানান যে এদের এঁকেই তো পুরস্কার লাভ, তাই পাওনা অর্থের উপর সর্বাগ্রে দাবিদার নাকি এরাই। আর্ট কলেজ জীবনে তাঁর ছাত্রসুলভ দক্ষতা সর্বজনবিদিত। আলো-ছায়ার সুষ্ঠ বিন্যাস, তুলি চালনার সাবলীলতা এবং বাস্তব সম্পৃক্ত কল্পনা সহজেই রসিকের মন টেনেছে। দক্ষতার কারণের ছাত্রাবস্থার একক প্রদর্শনীর যোগ্যতা অর্জন করেন তিনি, প্রসঙ্গত জানাই তাঁর প্রথম একক অনুষ্ঠিত হয়েছিল গৌহাটি কটন কলেজে, বিষয়ভাবনা অবশ্যই ঘোড়া। কলিকাতায় তাঁর প্রথম একক প্রদর্শনী ১৯৫৯ সালের নভেম্বরে, স্থান আর্টিস্ট্রি হাউজ।
১৯৬০ সালে সুনীলের জীবনে ঘটল দুটি প্রধান ঘটনা যার একটি হল ব্যঙ্গচিত্রী ও শিল্পসমালোচক অহিভূষণ মালিকের পৌরহিত্যে সৃষ্ট 'সোসাইটি অব কন্টেম্পোরারী আর্টিষ্টস' এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হওয়া আর অপরটি ফরাসী সরকারের বৃত্তি নিয়ে ফ্রান্সে ম্যুরাল শিখতে যাওয়া। সুনীলের জীবনে এটি অন্যতম মোচড়। এই সময় থেকে বদল ঘটে তাঁর দর্শন, অঙ্কন পদ্ধতি এবং অনুসন্ধান পর্ব। প্যারিসে পৌঁছে তিনি নাড়া বাঁধলেন Monsieur Shappla Midie-র কাছে উদ্দেশ্য ইটালিয়ার ফ্রেশকো। শিখলেন কিভাবে আট ইঞ্চি X ১৬ ইঞ্চি ড্রইংকে আট ফুট X ষোল ফুট দেওয়ালে গেঁথে ফেলা যায়। ফ্রেশকো নিয়ে পরবর্তীকালে কাজ না করলেও এই অভিজ্ঞতা তাকে সাহায্য করেছিল 'রোটেশন অব ম্যানকাইন্ড' চিত্রমালার ১০ ফুট X ১০ ফুট ছবিগুলি সৃষ্টি করতে। এইসময় প্রফেসর মঁসিও বোবা-র কাছে শিখেছিলেন চিত্রকলার পাঠ এবং উইলিয়াম হেটারের কাছে ছাপচিত্র (গ্রাফিক্স)। চারবছরের শিক্ষানবিশকালে তিনি বাকি সময়টা কাটিয়েছিলেন সংগ্রহশালা এবং প্রদর্শনী দেখে। সঙ্গে অনুভব করেছিলেন অবশ্যই ইউরোপের গতি, দ্রুত জীবন এবং প্রযুক্তির বিকাশ সম্পর্কে ধারণা। এই সময়ে এঁকেছেন অজস্র ঘোড়া, প্রতিমাকল্প এবং ষাঁড়, ষাঁড়ের চিত্রকল্পটি তিনি ওদেশ থেকে বয়ে নিয়ে আসেন এদেশে নিজের কাজের তাগিদে কারণ এদেশের ষাঁড়ের যে চিত্রকল্পটি আমরা জানি সেটি হল মহাদেবের বাহন এবং শক্তিশালী কিন্তু শান্ত এক একক।
বিদেশে গিয়ে সেখান থেকে দেশকে অনুভব করা যে কোনো সৃষ্টিশীল মানুষের পক্ষে স্বাভাবিক মোচড়। এই মোচড়ই চিনিয়ে দেয় আমাদের সত্যিকারের অস্তিত্বকে। যেটি হয়েছিল বাংলাদেশের শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের ক্ষেত্রে। এটা অনেকটাই গণেশ পাইন বর্ণিত গুটি গুটি পায়ে পাহাড়ের শীর্ষে পৌঁছে সেখান থেকে পাদদেশকে দেখা আর তারপর গুটি গুটি পায়ে পাদদেশে ফিরে আসা ... তবে বিষয়ভাবনাটি পৃথক প্রবন্ধের দাবী করে। যাক হোক ১৯৬২ সালে প্যারিসে এক ভারতীয় পন্ডিতের দর্শন এবং তন্ত্র বিষয়ক বক্তৃতা সুনীল দাশের মনে চিরস্থায়ী দাগ কাটে। তিনি শুরু করলেন এক চিত্রমালা যেখানে কাঠের উপর ব্লো টর্চ এর সাহায্যে ভারতীয় তন্ত্র মোটিফ বৃত্ত, ত্রিভুজ মন্ডল, জন্মছক ইত্যাদি সহযোগে গড়ে তুললেন এক অনবদ্য রচনা সম্ভার। এও একপ্রকার ভারতীয়ত্বকে বুঝে নেওয়ার প্রয়াস বলা যেতে পারে যার রেশ তাঁর পরবর্তী সিরিজে অনুভূত হয়ে। প্যারিসের শেষপর্বে কিছুকাল সুনীল কাঠ কেটে পুড়িয়ে, পলিথিন জ্বালিয়ে অনেকটা কোলাজের মত কাজ করার চেষ্টাও করেছিলেন। এরপর নেপালি কাগজে জলরঙ এবং তার উপর অন্য কাগজের টুকরো জুড়ে একধরণের অভিনব প্রচেষ্টা করেছিলেন যেখানে ছিল ভারতীয় অনুচিত্রের স্পেস-ডিভিশনকে বুঝে নেওয়ার তাড়ণা। এই পর্বের কাজগুলিকে সুনীল নামকরণ করেছিলেন 'মনের নিসর্গ'।
দেশে ফিরে ১৯৬৫ সালে সুনীল কাগজ পিছন থেকে অল্প পুড়িয়ে তার মেটে-কালো রঙকে আধার করে কিছু পরীক্ষামূলক কাজ করেন অনেকটা কোলাজ পদ্ধতি অনুসারে। এই পর্বের কাজগুলিতে পাশ্চাত্যের সমসাময়িক প্রভাব বর্তমান। দিল্লিতে কিছুদিন শিল্পশিক্ষকতা করার পর এই বছরে তিনি Weaver's Servide Centre এর চাকরিতে যোগ দেন এবং সসম্মানে ১৯৯৭ সালে অবসর নেন। এই সময়ে পর্বে তাঁর দৈনিক রুটিন ছিল অফিস থেকে ফিরে সোজা স্টুডিয়োতে চলে যাওয়া এবং আত্মবিশ্লেষণে মগ্ন হওয়া।
পরবর্তী প্রায় দশ বছর সুনীলের কাজকে সমালোচক আর রসিকমহল নির্দিষ্ট করেছেন 'হেভি ইমপ্যাস্টো' কাজ হিসাবে। ছবিতে এইসময়ে এসেছে তন্ত্রের আট পাপড়ি পদ্মফুল, বৃত্ত, পরস্পর সংলগ্ন ত্রিভুজ (যন্ত্র) ইত্যাদি। সঙ্গে জুড়েছে লোকসাহিত্যের দেবদেবীর বিমূর্ত রূপ অর্থাৎ সিঁদুর লেপা পাথর অথবা পাথরে জড়ানো লাল শালু। ছবি কিছুটা ত্রি-স্তরীয় অনুভূতির জন্য রঙে মিশিয়েছেন বালি, জুড়েছেন কড়ি, ঝিনুক কাচ বা কাচের চুড়ি এবং লোকায়ত ঐতিহ্যের উপকরণ। সুনীল এইসব ছবিতে চেয়েছিলেন ঐতিহাসিক পুনরুজ্জীবন ... উজ্জ্বল রঙের ব্যবহার (পটুয়া প্রভাব) ... শিরীষ, সিন্থেটিক আঠা, কাঠের গুঁড়ো, বালি, বার্নিশ, রজন সহযোগে সৃষ্ট এইসকল কাজে ভারতে ভ্রমণকারী বিদেশীরা পেতেন তাদের অণ্বেষীত ভারতীয়ত্ব। বিদেশেও প্রদর্শিত এবং প্রশংসিত হয়েছিল এই কাজগুলি।
পরের দুই-চার বছর সুনীল Bangladesh Drawings নামে বেশ কিছু ড্রইং করেছিলেন যা ছিল রাজনৈতিক অনাচারে-অত্যাচারের দলিল। কাজ করেছিলেন খবরের কাগজের Flong-এর উপর কালি ও জলরঙ দিয়ে আঁকিবুঁকি ছবি। হেটারের কাছে শেখা গ্রাফিক্সের পুনঃমূল্যায়ণ বটে। আবার ফিরে এলেন ভারতীয় ঐতিহ্যের পুনঃনির্মানে, সঙ্গে মেশালেন ফ্রয়েড বর্ণিত পরাবাস্তববার। ক্যানভাসে ফ্ল্যাট রঙ লাগিয়ে এর উপর আঁকলেন আকাশে উড্ডীন হাতি পদ্মফুল ইত্যাদি।
১৯৭৫ সালে সুনীল দাশের হাতে এল একটি বই যাতে ছিল বাইবেল বর্ণিত আদম-ইভের গল্প।
আঁকলেন 'আপেল' সিরিজ, মানবমানবীর যৌন-পরাবাস্তবীয় চেতনা যেখানের পুঞ্জীভূত রহস্যঘন রচনা আবার আমাদের মনে করালো শিল্পীর পাশ্চাত্য আধুনিক আঙ্গিক এবং ভারতীয় চেতনার মেলবন্ধন। ১৯৭৬-৭৭ সালে তিনি ফিরে আসেন নিজের বাস্তবিক চেতনায়। এই পর্যায়ের শিরোনাম 'রোটেশন অব ম্যানকাইন্ড'। ম্যুরাল অনুশীলনের অভ্যাস এবং রচনাগুণকে হাতিয়ার করে ১০ফুট X১০ফুট সুবিশাল ক্যানভাসে এঁকে ফেললেন মানবের সৃষ্টি ধ্বংস জীবনের আবর্তন। সমালোচকের অনেকেই মনে করেন এটা পূর্ববর্তী আপেল সিরিজের পরিবর্ধিত রূপ। যদিও শিল্পী এখানে রূপকল্পগুলি নির্দয়ভাবে ভেঙেছেন, দুমড়েছেন মাঝে মধ্যে তন্ত্র-অভিজ্ঞতার জ্যামিতিক পরিমন্ডল, পুঞ্জীভূত অন্ধকার এনেছেন ...মাখিয়েছেন নকশাল আন্দোলনের হিংসা এবং মৃত্যুর আবেশ।
১৯৭৯-৮১ এই সময়কালটিতে সৃষ্ট হয় 'ক্যাপটিভ' চিত্রমালা। ইমারজেন্সি-মূল্যবোধের অবমূল্যায়ন-অর্থনৈতিক রাজনৈতিক সামাজিক অথবা পারিবারিক বাধা যা মানুষকে/শিল্পচেতনাকে আবদ্ধ করে রাখে স্ফুরণে আঘাত করে তাই ছিল প্রধান উপজীব্য। ছবিতে গাঢ় বাদামির আধিক্য অন্তত সেইদিকেই ইঙ্গিত করে। এই চেতনার পরিশালিত রূপ আমরা দেখি 'কনফ্রনট্রেশন' সিরিজের ছবিগুলিতে, যেখানে বড় বড় ক্যানভাসে শিল্পী কেবলই শূন্যতাকে ধরতে চেয়েছেন ... এই চেতনা চলেছিল পুরো আশির দশক ধরে। পরবর্তী দশকের শুরুতে শিল্পী শুরু করেন 'শী' শিরোনামে কিছু ছবি ... আপাত রোমান্টিক রূপনির্মাণ যেখানে অন্ধকারাচ্ছন্ন নারীর মুখমন্ডলে উজ্জ্বল কনীনিকার উপস্থাপনা দর্শক মহলে সমাদার পেয়েছে। এই সিরিজে মাঝে মধ্যে শিল্পী নিজেই মূর্ত হয়েছেন যার থেকে পরবর্তী কালে সৃষ্ট হয়েছে আত্মপ্রতিকৃতি অন্বেষণ চিত্রমালাটি।
গত শতাব্দীর ৯০-এর দশকে সুনীল দাশ সৃষ্টি করেন তাঁর বিখ্যাত ড্রইং-ইনস্টলেশনধর্মী চিত্রকল্প। কালিকলমে ড্রইং করে তার মধ্যে পোড়া কাগজ সেঁটেছেন, আলপিন বা স্টেপলারের পিন এঁটেছেন, কোথাও কাগজ পুড়িয়েছেন, লিখেছেন শব্দরাজি। এইসময়ের শিল্পভাবনা সরাসরি তাঁর মুখ থেকে উদ্ধৃত করি :
" আমার ভয় হয় যে মানুষ আমার চারপাশে উঁচু দেওয়াল তুলে, আমাকে আবদ্ধ করতে পারে। কঠিন মাদকে আমাকে আচ্ছন্ন করে রাখতে পারে। জ্ঞানগর্ভ মিথ্যা দিয়ে আমাকে প্রলুব্ধ করতে পারে। কালো দন্ডে আমাকে পেষণ করতে পারে। আমাকে রক্তে স্নান করাতে পারে। আমি শিব। আমি বিষ পান করি। আমার দেহকে আমি টুকরো টুকরো করে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে। ক্রসের উপর নিজেকে আমি পেরেক দিয়ে বিদ্ধ করি। এবং আমি নিজেকে পোড়াই। আমার অনেক বন্ধু আছে যারা ক্ষমতাবান আমলা। প্রতিদিন তারা কিছু নির্দয় কাজ করে। কিছু অবিচার করে। যথাসাধ্য চেষ্টা করে ভুলকে ঠিক প্রমাণ করতে। আমি তাদের বিরুদ্ধে কিছু বলতে পারি না, কেননা তারা আমার বন্ধু। তাই ভারতবর্ষে আমি ছিন্নবিচ্ছিন্ন হই। সোমালিয়ায় আমি অনাহারে মরি। উপসাগরীয় যুদ্ধের আগুনে আমি পুড়ি। ওরা আমাকে হত্যা করছে - আমাকে, ব্যক্তিকে, মানুষকে। ... আমার শিল্প, এই মুহূর্তে বিশ্ব-আত্মার সেই যন্ত্রণার প্রতিফলন। এখানে যা দেখা যাচ্ছে, সেটা নিছক কাগজ নয়। আমার শরীর। মূক প্রতিবাদের তাপে ক্ষতবিক্ষত হয়ে নিরাময়হীনতায় যে শরীর ভিতরের দিকে সিঁটিয়ে যেতে চাইছে ...।"
এর পরবর্তী সময়কালে শিল্পী আবার তাঁর নিজসৃষ্টির পুনঃনির্মানে ফিরে যান। ঘুরে ফিরে আগের আঁকা সিরিজ ক্যানভাসে মূর্ত হয়। যে ঘোড়া ও ষাঁড়ের ড্রইং তাকে বিখ্যাত করেছিলে সেগুলিকে আবার তেলরঙে/অ্যাক্রিলিকে নির্মান করেন ... আশির দশক থেকে যে বাজার কেন্দ্রিক শিল্পনির্মাণ হয়েছিল এটা তার পাশ্বক্রিয়া বলেই মনে হয়। গত শতাব্দীর শেষ অথবা এই শতাব্দীর শুরুতে (মাফ করবেন এই সম্পর্কে সঠিক সময়কার লেখকের অজানা) একটি দুর্ঘটনায় সুনীল দাশের ডানহাত আঘাত পায় এবং ঐ হাতে কাজ করার ক্ষমতা হারান কিন্তু অদম্য শিল্পী তাঁর বামহাতটিকে প্রস্তুত করেন এবং জীবনের শেষদিন পর্যন্ত কাজ করে যান। এরই মধ্যে সুনীল ভাস্কর্যে আকৃষ্ট হন এবং বেশ কিছু ভাস্কর্য (যার মধ্যে ঘোড়া ও ষাঁড়ের প্রতিকৃতিই বেশি) দর্শকদের উপহার দেন।
ফিরে আসি নিজ অভিজ্ঞতার কথায়। ICCR Kolkata-এর সেই প্রদর্শনীকক্ষে এসে জানতে পারি যামিনী রায়ের পরেই নাকি সুনীল দাশের ছবি সবথেকে বেশি নকল করা হয়েছে। তাহলে সুনীল দাশের কোন পর্বের ছবি নকল হয়েছিল ? অবশ্যই তাঁর ঘোড়া এবং ষাঁড় সিরিজের ড্রইং এবং পরবর্তীকালের এই বিষয়ক পেন্টিংগুলি। প্রদর্শনীকক্ষে জাল ছবি ঝুলিছে দেখে সুনীল দাশ ছবিটির উপর FAKE শব্দটি লিখে দিলেন । ডাকা হল সংগ্রাহক ভদ্রমহিলাটিকে। একমুখ উৎকণ্ঠা নিয়ে তিনি হাজির হলেন, শিল্পীকে দেখালেন তাঁর সই করা ফটোগ্রাফ সহ দলিল (autheticity certificate) যাতে সুনীল দাশের সাক্ষর জ্বলজ্বল করছে। একটানে দলিলটি কেড়ে নিয়ে শিল্পী ছিঁড়ে ফেললেন আর জানালেন যে দলিলে সই করার সময় সন্ধ্যাবেলা আলোতে তিনি নাকি বুঝতে পারেন নি পাঠানো ফটোগ্রাফটির ছবিটি জাল। উনি দর্শকদের আশ্বস্ত করলে যে লোকের কাছ থেকে ওই ভদ্রমহিলা ছবিটি কিনেছেন তাকে আদালতে দেখে নেবেন ... কিন্তু ভদ্রমহিলার তো তিরিশ লাখ টাকাই জলে !!!
সবসুদ্ধ নাকি ২০৩৭টি ছবি জাল !!! পরবর্তীকালে কলিকাতার 'গ্যালারি কলকাতা'তে ২০১১ সালের ২৬শে ফেব্রুয়ারি থেকে ২৬শে মার্চ পর্যন্ত একটি বিশাল প্রদর্শনী করা হয় যেখানে শিল্পীর আসল ছবির পাশাপাশি জাল ছবি রাখা ছিল যাতে দর্শকরা নিজেরাই পরখ করতে পারে আসল সুনীল দাশকে। শিরোনাম ছিল BEWARE / BE-AWARE । এটাও ভারতীয় শিল্পইতিহাসে অন্যতম নাটকীয় ঘটনা বলে জানি।
শিল্পী সুনীল দাশ ছিলেন ভালো-মন্দ মেশানো এক ব্যক্তিত্ব। শিল্পকলার আঙ্গিক দক্ষতায় তিনি ছিলেন অবিসংবাদিত। সফলতা অথবা সুনাম যাই বলি না কেন তা এসেছে অতি অল্পবয়সেই। সারাজীবন সরকারী চাকুরী করেছেন বেশ উচ্চপদেই। এতগুলি সুলক্ষণ যে কোনো শিল্পী সম্পর্কে প্রত্যাশা বৃদ্ধি করে। চিরকাল ছিলেন নাটকীয়, অদম্য কিন্তু কোথায় রাশ টানতে হয় সেই বিষয়ে ছিলেন সন্দিগ্ধ। দেশে বিদেশে তাঁর একক এবং দলগত প্রদর্শনী যে কোনো শিল্পীকে ঈর্ষায় ফেলবে। জীবনে অজস্র শিল্পী, শিল্পশিক্ষার্থী এবং সাধারণ মানুষকে অর্থদান ও প্রয়োজনীয় উপকার করেছেন একথা তাঁর চরম শত্রুও স্বীকার করবেন। নিজের কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য বার্ষিক পুরস্কারের ব্যবস্থা করেছেন যাতে তারা শিল্পকলায় উৎসাহ পায়। বার বার বিতর্কে জড়িয়েছেন। অভিযোগ উঠেছিল নিজের জাল ছবিতে সাক্ষর করার, পুরাতন কাগজে স্বর্ণযুগের ঘোড়া ও ষাঁড় এঁকে তাকে পুরানো বলে দাবি করা ইত্যাদি ইত্যাদি। এমনিতে ছবিতে কোনো বাঁধাধরা দর্শনে তিনি বিশ্বাসী ছিলেন না ... বারংবার দেখা গিয়েছে যে সিরিজ সৃষ্টি করতেন তার শেষ পর্যায়ে না পৌঁছেই হঠাৎ করে অন্য সিরিজে মনোনিবেশ। এই সকল কারণে একাদেমিক দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও পাশ্চাত্য ও ভারতীয় দর্শনের সঙ্গে শিল্পী সুনীল দাশের ব্যক্তিত্বের মননের রসায়ন ফলস্রুত হয়েছিলো কিনা সেই নিয়ে আজও সংশয় রয়ে গিয়েছে। । যার কারণে তরুণ প্রজন্মের কাছে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা সেইভাবে অনুভূত হয় নি ... সৃষ্টি হয় নি কোনো উত্তরসূরী।
যতই বিতর্ক থাকুক আধুনিক সমসাময়িক ভারতের শিল্পকলার জগতে শিল্পী সুনীল দাশের নাম পাকাপাকি ছাপা হয়ে গেছে, এ বিষয়ে শিল্পমহল বা দর্শক মহলের কোনো সংশয় নেই। আমাদের যাবতীয় তর্ক, অভিযোগ বা অনুযোগকে মুক্তি দিয়ে ... পরলোকে গমন করলেন গত ১০ই আগষ্ট, ২০১৫ ভোররাতে।
অমিত বিশ্বাস
কৃষ্ণনগর
২৪/০৯/২০১৫
কলম আর সরছিল না, অনেকবার ভেবেছি লিখব কি লিখব না ...
'ঘোড়া সুনীল' এই নামে বেশি জনপ্রিয় ছিলেন তিনি, শোনা যায় নামটি স্বয়ং রামকিংকরের দেওয়া। আত্মজীবনীতে লিখেছেন টেলিফোন তুলে নিজে ঘোষণা করতেন 'ঘোড়া দাস' বলছি !!! বিতর্ক সারাজীবন পিছু নিলেও মৃত্যুর খবর সোশ্যাল নেটওয়ার্কে পোষ্ট হতেই ভাইরাল হয়ে যায় এতটাই যার জনপ্রিয়তা। সর্বদা থেকেছেন বন্ধু-বান্ধর পরিবৃত হয়েও (হ্যাঁ অবশ্যই অনেক সময় পরিষদবর্গ চামচ সহ)। আসলে কয়েক বছর আগে প্রথম দর্শনটি মোটেই সুখকর হয় নি, অথচ যা হওয়াই স্বাভাবিক ছিল এই বাংলার অন্যতম চিত্রী ও ভাস্কর সুনীশ দাশের সম্পর্কে।
"It's a fake"
আচমকা এই চিৎকার আর ফ্ল্যাশবাল্বের ঝলকানিতে প্রথম চাক্ষুষ দর্শন হয়েছিল এইসময়ের বর্যীয়ান শিল্পী সুনীল দাশের সঙ্গে ICCR গ্যালারী, কলিকাতায় । নিজের আঁকা তিরিশলাখি ছবিটিকে মুহূর্তের মধ্যে খারিজ করে দিলেন শিল্পী, যেটি প্রধান আকর্ষণ হিসাবে ঝোলানো ছিল এই প্রদর্শনীকক্ষেই। এই ধরণের নাটকীয়তার দেখতে আমরা অভ্যস্ত নই। আর উনি নির্বিকারে পরের কর্মসূচীতে মনোনিবেশ করলেন !!!
না, শুরুটা মোটেই এইরকম ছিলো না ...
সুনীল দাশ জন্মগ্রহণ করেন ১৯৩৯ সালের আগষ্ট মাসের ৪ তারিখে পিতামাতার পঞ্চম সন্তান হিসাবে, কলিকাতার কালিঘাট অঞ্চলে। শিল্পকলার প্রতি ঝোঁক সেই ছোটবেলা থেকে যা সমৃদ্ধ হয়েছিল সিনেমার ব্যানার আঁকিয়েদের কাজ এবং কালিঘাটের মন্দির পার্শ্ববতী দোকানে ঝোলানো পট দেখতে দেখতে। ছোট ব্যবসায়ী পরিবারের শিল্পকলাপ্রেমী কোনো ধারাবাহিক ইতিহাস না থাকা সত্ত্বেও পড়াশুনা শেষ করে প্রথমে ইন্ডিয়ার স্কুল এবং পরে গভর্মেন্ট কলেজে ভর্তি হন তিনি, সরাসরি দ্বিতীয় বর্ষে। কারণ একটাই ... ড্রইং-এর হাত খুব ভালো। কলেজের চতুর্থবর্ষের ছাত্র থাকাকালীন ১৯৫৯ সালে ললিতকলা একাদেমির জাতীয় পুরস্কার পান ঘোড়ার ড্রইং এর জন্য এবং একই বছর একাদেমির বার্ষিক প্রদর্শনীতে কাজ দেখে এক আমেরিকান তাঁর সাতটি ড্রইং সংগ্রহ করেন সাতশো টাকায় ...এটা সেই সময় বলা যেতে পারে ভারতীয় শিল্পমহলের নজিরবিহীন ঘটনা।
মাষ্টারমহাশয়দের কাছে শুনেছিলেন যত অ্যানিমেল ড্রইং করা যায় তত হাত খোলে। তাই ছাত্রাবস্থায় নিয়মিত রেসের মাঠ এবং পুলিশ আস্তাবলই হয়ে ওঠে সুনীল দাশের দ্বিতীয় আস্তানা। এই সময়ের একটি গল্প শিল্পীমহলে শোনা যায়। জাতীয় পুরস্কার পাওয়ার অর্থ দিয়ে শিল্পী একটিন বিস্কুট সংগ্রহ করে পুলিশের আস্তাবলে পৌঁছায় এবং নিজের হাতে সব ঘোড়াকে খাওয়ান। বন্ধুরা প্রশ্ন করলে নির্বিকারে জানান যে এদের এঁকেই তো পুরস্কার লাভ, তাই পাওনা অর্থের উপর সর্বাগ্রে দাবিদার নাকি এরাই। আর্ট কলেজ জীবনে তাঁর ছাত্রসুলভ দক্ষতা সর্বজনবিদিত। আলো-ছায়ার সুষ্ঠ বিন্যাস, তুলি চালনার সাবলীলতা এবং বাস্তব সম্পৃক্ত কল্পনা সহজেই রসিকের মন টেনেছে। দক্ষতার কারণের ছাত্রাবস্থার একক প্রদর্শনীর যোগ্যতা অর্জন করেন তিনি, প্রসঙ্গত জানাই তাঁর প্রথম একক অনুষ্ঠিত হয়েছিল গৌহাটি কটন কলেজে, বিষয়ভাবনা অবশ্যই ঘোড়া। কলিকাতায় তাঁর প্রথম একক প্রদর্শনী ১৯৫৯ সালের নভেম্বরে, স্থান আর্টিস্ট্রি হাউজ।
১৯৬০ সালে সুনীলের জীবনে ঘটল দুটি প্রধান ঘটনা যার একটি হল ব্যঙ্গচিত্রী ও শিল্পসমালোচক অহিভূষণ মালিকের পৌরহিত্যে সৃষ্ট 'সোসাইটি অব কন্টেম্পোরারী আর্টিষ্টস' এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হওয়া আর অপরটি ফরাসী সরকারের বৃত্তি নিয়ে ফ্রান্সে ম্যুরাল শিখতে যাওয়া। সুনীলের জীবনে এটি অন্যতম মোচড়। এই সময় থেকে বদল ঘটে তাঁর দর্শন, অঙ্কন পদ্ধতি এবং অনুসন্ধান পর্ব। প্যারিসে পৌঁছে তিনি নাড়া বাঁধলেন Monsieur Shappla Midie-র কাছে উদ্দেশ্য ইটালিয়ার ফ্রেশকো। শিখলেন কিভাবে আট ইঞ্চি X ১৬ ইঞ্চি ড্রইংকে আট ফুট X ষোল ফুট দেওয়ালে গেঁথে ফেলা যায়। ফ্রেশকো নিয়ে পরবর্তীকালে কাজ না করলেও এই অভিজ্ঞতা তাকে সাহায্য করেছিল 'রোটেশন অব ম্যানকাইন্ড' চিত্রমালার ১০ ফুট X ১০ ফুট ছবিগুলি সৃষ্টি করতে। এইসময় প্রফেসর মঁসিও বোবা-র কাছে শিখেছিলেন চিত্রকলার পাঠ এবং উইলিয়াম হেটারের কাছে ছাপচিত্র (গ্রাফিক্স)। চারবছরের শিক্ষানবিশকালে তিনি বাকি সময়টা কাটিয়েছিলেন সংগ্রহশালা এবং প্রদর্শনী দেখে। সঙ্গে অনুভব করেছিলেন অবশ্যই ইউরোপের গতি, দ্রুত জীবন এবং প্রযুক্তির বিকাশ সম্পর্কে ধারণা। এই সময়ে এঁকেছেন অজস্র ঘোড়া, প্রতিমাকল্প এবং ষাঁড়, ষাঁড়ের চিত্রকল্পটি তিনি ওদেশ থেকে বয়ে নিয়ে আসেন এদেশে নিজের কাজের তাগিদে কারণ এদেশের ষাঁড়ের যে চিত্রকল্পটি আমরা জানি সেটি হল মহাদেবের বাহন এবং শক্তিশালী কিন্তু শান্ত এক একক।
বিদেশে গিয়ে সেখান থেকে দেশকে অনুভব করা যে কোনো সৃষ্টিশীল মানুষের পক্ষে স্বাভাবিক মোচড়। এই মোচড়ই চিনিয়ে দেয় আমাদের সত্যিকারের অস্তিত্বকে। যেটি হয়েছিল বাংলাদেশের শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের ক্ষেত্রে। এটা অনেকটাই গণেশ পাইন বর্ণিত গুটি গুটি পায়ে পাহাড়ের শীর্ষে পৌঁছে সেখান থেকে পাদদেশকে দেখা আর তারপর গুটি গুটি পায়ে পাদদেশে ফিরে আসা ... তবে বিষয়ভাবনাটি পৃথক প্রবন্ধের দাবী করে। যাক হোক ১৯৬২ সালে প্যারিসে এক ভারতীয় পন্ডিতের দর্শন এবং তন্ত্র বিষয়ক বক্তৃতা সুনীল দাশের মনে চিরস্থায়ী দাগ কাটে। তিনি শুরু করলেন এক চিত্রমালা যেখানে কাঠের উপর ব্লো টর্চ এর সাহায্যে ভারতীয় তন্ত্র মোটিফ বৃত্ত, ত্রিভুজ মন্ডল, জন্মছক ইত্যাদি সহযোগে গড়ে তুললেন এক অনবদ্য রচনা সম্ভার। এও একপ্রকার ভারতীয়ত্বকে বুঝে নেওয়ার প্রয়াস বলা যেতে পারে যার রেশ তাঁর পরবর্তী সিরিজে অনুভূত হয়ে। প্যারিসের শেষপর্বে কিছুকাল সুনীল কাঠ কেটে পুড়িয়ে, পলিথিন জ্বালিয়ে অনেকটা কোলাজের মত কাজ করার চেষ্টাও করেছিলেন। এরপর নেপালি কাগজে জলরঙ এবং তার উপর অন্য কাগজের টুকরো জুড়ে একধরণের অভিনব প্রচেষ্টা করেছিলেন যেখানে ছিল ভারতীয় অনুচিত্রের স্পেস-ডিভিশনকে বুঝে নেওয়ার তাড়ণা। এই পর্বের কাজগুলিকে সুনীল নামকরণ করেছিলেন 'মনের নিসর্গ'।
দেশে ফিরে ১৯৬৫ সালে সুনীল কাগজ পিছন থেকে অল্প পুড়িয়ে তার মেটে-কালো রঙকে আধার করে কিছু পরীক্ষামূলক কাজ করেন অনেকটা কোলাজ পদ্ধতি অনুসারে। এই পর্বের কাজগুলিতে পাশ্চাত্যের সমসাময়িক প্রভাব বর্তমান। দিল্লিতে কিছুদিন শিল্পশিক্ষকতা করার পর এই বছরে তিনি Weaver's Servide Centre এর চাকরিতে যোগ দেন এবং সসম্মানে ১৯৯৭ সালে অবসর নেন। এই সময়ে পর্বে তাঁর দৈনিক রুটিন ছিল অফিস থেকে ফিরে সোজা স্টুডিয়োতে চলে যাওয়া এবং আত্মবিশ্লেষণে মগ্ন হওয়া।
পরবর্তী প্রায় দশ বছর সুনীলের কাজকে সমালোচক আর রসিকমহল নির্দিষ্ট করেছেন 'হেভি ইমপ্যাস্টো' কাজ হিসাবে। ছবিতে এইসময়ে এসেছে তন্ত্রের আট পাপড়ি পদ্মফুল, বৃত্ত, পরস্পর সংলগ্ন ত্রিভুজ (যন্ত্র) ইত্যাদি। সঙ্গে জুড়েছে লোকসাহিত্যের দেবদেবীর বিমূর্ত রূপ অর্থাৎ সিঁদুর লেপা পাথর অথবা পাথরে জড়ানো লাল শালু। ছবি কিছুটা ত্রি-স্তরীয় অনুভূতির জন্য রঙে মিশিয়েছেন বালি, জুড়েছেন কড়ি, ঝিনুক কাচ বা কাচের চুড়ি এবং লোকায়ত ঐতিহ্যের উপকরণ। সুনীল এইসব ছবিতে চেয়েছিলেন ঐতিহাসিক পুনরুজ্জীবন ... উজ্জ্বল রঙের ব্যবহার (পটুয়া প্রভাব) ... শিরীষ, সিন্থেটিক আঠা, কাঠের গুঁড়ো, বালি, বার্নিশ, রজন সহযোগে সৃষ্ট এইসকল কাজে ভারতে ভ্রমণকারী বিদেশীরা পেতেন তাদের অণ্বেষীত ভারতীয়ত্ব। বিদেশেও প্রদর্শিত এবং প্রশংসিত হয়েছিল এই কাজগুলি।
পরের দুই-চার বছর সুনীল Bangladesh Drawings নামে বেশ কিছু ড্রইং করেছিলেন যা ছিল রাজনৈতিক অনাচারে-অত্যাচারের দলিল। কাজ করেছিলেন খবরের কাগজের Flong-এর উপর কালি ও জলরঙ দিয়ে আঁকিবুঁকি ছবি। হেটারের কাছে শেখা গ্রাফিক্সের পুনঃমূল্যায়ণ বটে। আবার ফিরে এলেন ভারতীয় ঐতিহ্যের পুনঃনির্মানে, সঙ্গে মেশালেন ফ্রয়েড বর্ণিত পরাবাস্তববার। ক্যানভাসে ফ্ল্যাট রঙ লাগিয়ে এর উপর আঁকলেন আকাশে উড্ডীন হাতি পদ্মফুল ইত্যাদি।
১৯৭৫ সালে সুনীল দাশের হাতে এল একটি বই যাতে ছিল বাইবেল বর্ণিত আদম-ইভের গল্প।
আঁকলেন 'আপেল' সিরিজ, মানবমানবীর যৌন-পরাবাস্তবীয় চেতনা যেখানের পুঞ্জীভূত রহস্যঘন রচনা আবার আমাদের মনে করালো শিল্পীর পাশ্চাত্য আধুনিক আঙ্গিক এবং ভারতীয় চেতনার মেলবন্ধন। ১৯৭৬-৭৭ সালে তিনি ফিরে আসেন নিজের বাস্তবিক চেতনায়। এই পর্যায়ের শিরোনাম 'রোটেশন অব ম্যানকাইন্ড'। ম্যুরাল অনুশীলনের অভ্যাস এবং রচনাগুণকে হাতিয়ার করে ১০ফুট X১০ফুট সুবিশাল ক্যানভাসে এঁকে ফেললেন মানবের সৃষ্টি ধ্বংস জীবনের আবর্তন। সমালোচকের অনেকেই মনে করেন এটা পূর্ববর্তী আপেল সিরিজের পরিবর্ধিত রূপ। যদিও শিল্পী এখানে রূপকল্পগুলি নির্দয়ভাবে ভেঙেছেন, দুমড়েছেন মাঝে মধ্যে তন্ত্র-অভিজ্ঞতার জ্যামিতিক পরিমন্ডল, পুঞ্জীভূত অন্ধকার এনেছেন ...মাখিয়েছেন নকশাল আন্দোলনের হিংসা এবং মৃত্যুর আবেশ।
১৯৭৯-৮১ এই সময়কালটিতে সৃষ্ট হয় 'ক্যাপটিভ' চিত্রমালা। ইমারজেন্সি-মূল্যবোধের অবমূল্যায়ন-অর্থনৈতিক রাজনৈতিক সামাজিক অথবা পারিবারিক বাধা যা মানুষকে/শিল্পচেতনাকে আবদ্ধ করে রাখে স্ফুরণে আঘাত করে তাই ছিল প্রধান উপজীব্য। ছবিতে গাঢ় বাদামির আধিক্য অন্তত সেইদিকেই ইঙ্গিত করে। এই চেতনার পরিশালিত রূপ আমরা দেখি 'কনফ্রনট্রেশন' সিরিজের ছবিগুলিতে, যেখানে বড় বড় ক্যানভাসে শিল্পী কেবলই শূন্যতাকে ধরতে চেয়েছেন ... এই চেতনা চলেছিল পুরো আশির দশক ধরে। পরবর্তী দশকের শুরুতে শিল্পী শুরু করেন 'শী' শিরোনামে কিছু ছবি ... আপাত রোমান্টিক রূপনির্মাণ যেখানে অন্ধকারাচ্ছন্ন নারীর মুখমন্ডলে উজ্জ্বল কনীনিকার উপস্থাপনা দর্শক মহলে সমাদার পেয়েছে। এই সিরিজে মাঝে মধ্যে শিল্পী নিজেই মূর্ত হয়েছেন যার থেকে পরবর্তী কালে সৃষ্ট হয়েছে আত্মপ্রতিকৃতি অন্বেষণ চিত্রমালাটি।
গত শতাব্দীর ৯০-এর দশকে সুনীল দাশ সৃষ্টি করেন তাঁর বিখ্যাত ড্রইং-ইনস্টলেশনধর্মী চিত্রকল্প। কালিকলমে ড্রইং করে তার মধ্যে পোড়া কাগজ সেঁটেছেন, আলপিন বা স্টেপলারের পিন এঁটেছেন, কোথাও কাগজ পুড়িয়েছেন, লিখেছেন শব্দরাজি। এইসময়ের শিল্পভাবনা সরাসরি তাঁর মুখ থেকে উদ্ধৃত করি :
" আমার ভয় হয় যে মানুষ আমার চারপাশে উঁচু দেওয়াল তুলে, আমাকে আবদ্ধ করতে পারে। কঠিন মাদকে আমাকে আচ্ছন্ন করে রাখতে পারে। জ্ঞানগর্ভ মিথ্যা দিয়ে আমাকে প্রলুব্ধ করতে পারে। কালো দন্ডে আমাকে পেষণ করতে পারে। আমাকে রক্তে স্নান করাতে পারে। আমি শিব। আমি বিষ পান করি। আমার দেহকে আমি টুকরো টুকরো করে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে। ক্রসের উপর নিজেকে আমি পেরেক দিয়ে বিদ্ধ করি। এবং আমি নিজেকে পোড়াই। আমার অনেক বন্ধু আছে যারা ক্ষমতাবান আমলা। প্রতিদিন তারা কিছু নির্দয় কাজ করে। কিছু অবিচার করে। যথাসাধ্য চেষ্টা করে ভুলকে ঠিক প্রমাণ করতে। আমি তাদের বিরুদ্ধে কিছু বলতে পারি না, কেননা তারা আমার বন্ধু। তাই ভারতবর্ষে আমি ছিন্নবিচ্ছিন্ন হই। সোমালিয়ায় আমি অনাহারে মরি। উপসাগরীয় যুদ্ধের আগুনে আমি পুড়ি। ওরা আমাকে হত্যা করছে - আমাকে, ব্যক্তিকে, মানুষকে। ... আমার শিল্প, এই মুহূর্তে বিশ্ব-আত্মার সেই যন্ত্রণার প্রতিফলন। এখানে যা দেখা যাচ্ছে, সেটা নিছক কাগজ নয়। আমার শরীর। মূক প্রতিবাদের তাপে ক্ষতবিক্ষত হয়ে নিরাময়হীনতায় যে শরীর ভিতরের দিকে সিঁটিয়ে যেতে চাইছে ...।"
এর পরবর্তী সময়কালে শিল্পী আবার তাঁর নিজসৃষ্টির পুনঃনির্মানে ফিরে যান। ঘুরে ফিরে আগের আঁকা সিরিজ ক্যানভাসে মূর্ত হয়। যে ঘোড়া ও ষাঁড়ের ড্রইং তাকে বিখ্যাত করেছিলে সেগুলিকে আবার তেলরঙে/অ্যাক্রিলিকে নির্মান করেন ... আশির দশক থেকে যে বাজার কেন্দ্রিক শিল্পনির্মাণ হয়েছিল এটা তার পাশ্বক্রিয়া বলেই মনে হয়। গত শতাব্দীর শেষ অথবা এই শতাব্দীর শুরুতে (মাফ করবেন এই সম্পর্কে সঠিক সময়কার লেখকের অজানা) একটি দুর্ঘটনায় সুনীল দাশের ডানহাত আঘাত পায় এবং ঐ হাতে কাজ করার ক্ষমতা হারান কিন্তু অদম্য শিল্পী তাঁর বামহাতটিকে প্রস্তুত করেন এবং জীবনের শেষদিন পর্যন্ত কাজ করে যান। এরই মধ্যে সুনীল ভাস্কর্যে আকৃষ্ট হন এবং বেশ কিছু ভাস্কর্য (যার মধ্যে ঘোড়া ও ষাঁড়ের প্রতিকৃতিই বেশি) দর্শকদের উপহার দেন।
ফিরে আসি নিজ অভিজ্ঞতার কথায়। ICCR Kolkata-এর সেই প্রদর্শনীকক্ষে এসে জানতে পারি যামিনী রায়ের পরেই নাকি সুনীল দাশের ছবি সবথেকে বেশি নকল করা হয়েছে। তাহলে সুনীল দাশের কোন পর্বের ছবি নকল হয়েছিল ? অবশ্যই তাঁর ঘোড়া এবং ষাঁড় সিরিজের ড্রইং এবং পরবর্তীকালের এই বিষয়ক পেন্টিংগুলি। প্রদর্শনীকক্ষে জাল ছবি ঝুলিছে দেখে সুনীল দাশ ছবিটির উপর FAKE শব্দটি লিখে দিলেন । ডাকা হল সংগ্রাহক ভদ্রমহিলাটিকে। একমুখ উৎকণ্ঠা নিয়ে তিনি হাজির হলেন, শিল্পীকে দেখালেন তাঁর সই করা ফটোগ্রাফ সহ দলিল (autheticity certificate) যাতে সুনীল দাশের সাক্ষর জ্বলজ্বল করছে। একটানে দলিলটি কেড়ে নিয়ে শিল্পী ছিঁড়ে ফেললেন আর জানালেন যে দলিলে সই করার সময় সন্ধ্যাবেলা আলোতে তিনি নাকি বুঝতে পারেন নি পাঠানো ফটোগ্রাফটির ছবিটি জাল। উনি দর্শকদের আশ্বস্ত করলে যে লোকের কাছ থেকে ওই ভদ্রমহিলা ছবিটি কিনেছেন তাকে আদালতে দেখে নেবেন ... কিন্তু ভদ্রমহিলার তো তিরিশ লাখ টাকাই জলে !!!
সবসুদ্ধ নাকি ২০৩৭টি ছবি জাল !!! পরবর্তীকালে কলিকাতার 'গ্যালারি কলকাতা'তে ২০১১ সালের ২৬শে ফেব্রুয়ারি থেকে ২৬শে মার্চ পর্যন্ত একটি বিশাল প্রদর্শনী করা হয় যেখানে শিল্পীর আসল ছবির পাশাপাশি জাল ছবি রাখা ছিল যাতে দর্শকরা নিজেরাই পরখ করতে পারে আসল সুনীল দাশকে। শিরোনাম ছিল BEWARE / BE-AWARE । এটাও ভারতীয় শিল্পইতিহাসে অন্যতম নাটকীয় ঘটনা বলে জানি।
শিল্পী সুনীল দাশ ছিলেন ভালো-মন্দ মেশানো এক ব্যক্তিত্ব। শিল্পকলার আঙ্গিক দক্ষতায় তিনি ছিলেন অবিসংবাদিত। সফলতা অথবা সুনাম যাই বলি না কেন তা এসেছে অতি অল্পবয়সেই। সারাজীবন সরকারী চাকুরী করেছেন বেশ উচ্চপদেই। এতগুলি সুলক্ষণ যে কোনো শিল্পী সম্পর্কে প্রত্যাশা বৃদ্ধি করে। চিরকাল ছিলেন নাটকীয়, অদম্য কিন্তু কোথায় রাশ টানতে হয় সেই বিষয়ে ছিলেন সন্দিগ্ধ। দেশে বিদেশে তাঁর একক এবং দলগত প্রদর্শনী যে কোনো শিল্পীকে ঈর্ষায় ফেলবে। জীবনে অজস্র শিল্পী, শিল্পশিক্ষার্থী এবং সাধারণ মানুষকে অর্থদান ও প্রয়োজনীয় উপকার করেছেন একথা তাঁর চরম শত্রুও স্বীকার করবেন। নিজের কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য বার্ষিক পুরস্কারের ব্যবস্থা করেছেন যাতে তারা শিল্পকলায় উৎসাহ পায়। বার বার বিতর্কে জড়িয়েছেন। অভিযোগ উঠেছিল নিজের জাল ছবিতে সাক্ষর করার, পুরাতন কাগজে স্বর্ণযুগের ঘোড়া ও ষাঁড় এঁকে তাকে পুরানো বলে দাবি করা ইত্যাদি ইত্যাদি। এমনিতে ছবিতে কোনো বাঁধাধরা দর্শনে তিনি বিশ্বাসী ছিলেন না ... বারংবার দেখা গিয়েছে যে সিরিজ সৃষ্টি করতেন তার শেষ পর্যায়ে না পৌঁছেই হঠাৎ করে অন্য সিরিজে মনোনিবেশ। এই সকল কারণে একাদেমিক দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও পাশ্চাত্য ও ভারতীয় দর্শনের সঙ্গে শিল্পী সুনীল দাশের ব্যক্তিত্বের মননের রসায়ন ফলস্রুত হয়েছিলো কিনা সেই নিয়ে আজও সংশয় রয়ে গিয়েছে। । যার কারণে তরুণ প্রজন্মের কাছে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা সেইভাবে অনুভূত হয় নি ... সৃষ্টি হয় নি কোনো উত্তরসূরী।
যতই বিতর্ক থাকুক আধুনিক সমসাময়িক ভারতের শিল্পকলার জগতে শিল্পী সুনীল দাশের নাম পাকাপাকি ছাপা হয়ে গেছে, এ বিষয়ে শিল্পমহল বা দর্শক মহলের কোনো সংশয় নেই। আমাদের যাবতীয় তর্ক, অভিযোগ বা অনুযোগকে মুক্তি দিয়ে ... পরলোকে গমন করলেন গত ১০ই আগষ্ট, ২০১৫ ভোররাতে।
অমিত বিশ্বাস
কৃষ্ণনগর
২৪/০৯/২০১৫






বেশ ভাল তথ্য মূলক প্রবন্ধ৷
ReplyDelete