...ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন, ইউরোপীয় বিভিন্ন মুক্তিযুদ্ধ, ব্রিটিশ কলোনীগুলির অশান্তির মধ্যে দিয়ে একটি নয়, দুটো বিশ্বযুদ্ধ পেরিয়ে এলো আর্ট কলেজ। সংবাদপত্র-শিল্পের বিস্ফোরণে বিজ্ঞাপনের চটজলদি প্রয়োজনে তৎক্ষণাৎ হাতে তৈরী নক্সা-ছবি সরকারি এই আর্ট কলেজের ছাত্ররা যেভাবে যোগান দিত তা অন্যরা পারতোনা। তার নিবিষ্ট নির্দিষ্ট কারণ হলো 'দেখে আঁকো' শৈলীর এতদিনকার পরম্পরা যে বাস্তবিক ব্যাকরণের ড্রয়িং-ড্রাফ্টিং গড়ে তুলেছে - সেই 'মুখস্ত বিদ্যা' খবরের কাগজের বিজ্ঞাপন বা কাহিনী চিত্রায়ণে (ইলাস্ট্রেশান্) ব্যাপক কাজে লাগলো। অব্যশ্য পাশাপাশি 'নবান্ন' যুগ, 'কল্লোল' চেতনা, আই.পি.টি.এ. তথা অন্যান্য সামাজিক বা সাংস্কৃতিক পরিবর্তন-চেতনা ও ছবির 'পোষ্টার ধর্মীতা' যেমন চালু রাখলো, তেমন 'শিল্পী'র নিজস্ব ছবির ভাষা তৈরীর ক্ষেত্রে প্রাথমিক ছবির ব্যাকরণের জোড় যুগপৎ সাহায্য করলো, আবার বাধাও দিতে থাকলো। প্রচলিত বুলি চালু হলো - 'ব্যাকরণ শিখে আবার ভুলতে হবে', নইলে শিল্পীর স্বকীয় দৃশ্যভাষা তৈরী হবে না! কিন্তু এই ভোলা কি সহজ? আজও চোখ বুজলে 'অ- য়ে অজগর আসছে তেড়ে' - জাতীয় ছড়া মন্ত্রের মতো মননে জেগে ওঠে - কষ্ট করে ভাবতে হয় না! এক্ষেত্রে যারা সাহিত্য-সঙ্গীত-নাটক-চলচ্চিত্র তথা সামগ্রিক জীবনকে মেধার সাথে মননমুখী করতে পারলো তাদের অনেকেই স্বকীয় শিল্পভাষা গড়ে তুলতে সক্ষম হলেন। আর্ট কলেজে প্রশিক্ষিত তেমন শিল্পীর সংখ্যা যথেষ্ট বেশী, কারো থেকে কম নয়! কিন্তু এটাও বাস্তব যে তার থেকে অনেকগুণ বেশী যারা শিল্পের ব্যবহারিক শিক্ষায় জীবনকে 'পালন' করতে সক্ষম হলো, কিন্তু 'লালন' করতে পারলেন না। স্বাধীনতা পেরিয়ে এই মন-উচাটন্ আত্ম-আন্দোলন নিরন্তর চললো আশির দশকের ওপারে।
তিনশতকের তেপান্তরে : কলকাতা 'আর্ট কলেজ' / ড. জয়ন্ত চৌধুরী
