শিল্পী বিকাশ ভট্টাচার্য প্রসঙ্গ
(১৯৪০-২০০৬)
'দেখবে একজন মজুর মাটি কাটার পর খুব যত্ন করে তাঁর কোদালটাকে পরিষ্কার করে রাখে। সে জানে যত্ন না করলে জিনিসটা নষ্ট হবে। বেশিদিন যাবে না। যে কোদাল তাঁর কাজের হাতিয়ার সঙ্গী, তাকে যত্ন না করলে সে কোনসময় ঠিকমতো কাজ নাও করতে পারে। বশে না-ও থাকতে পারে। ছবি যে আঁকবে তাঁর কাজের অঙ্গই হলো জিনিসপত্র ঠিকমতো গুছিয়ে রাখা।'
- শিল্পী বিকাশ ভট্টাচার্য
![]() |
| শিল্পী বিকাশ ভট্টাচার্য |
শিল্পী বিকাশ ভট্টাচার্য ছিলেন আপদমস্তক সুদর্শন ব্যক্তিত্ব ... মেধায় ও মননে। স্টুডিও ছিল কলিকাতার লালবাজার সংলগ্ন গ্র্যান্ট লেনে। পারিবারিক বিশাল বাড়িটি ছিল ওনার সহপাঠী কাত্যায়ন সাকলাতের যিনি শিল্পীমহলে কেটিদি নামে পরিচিত। এই বাড়ির দোতলায় একটি বড়মাপের ঘরে ছিল শিল্পীর স্টুডিও। এখানেই তিনি সৃষ্টি করেন তাঁর বিখ্যাত 'ডল সিরিজ' এর ছবিগুলি। উত্তর কলকাতার বনেদীয়ানা, নষ্ট্যালজিয়া এবং সেইসময়ের সামাজিক-রাজনৈতিক ভ্রষ্টাচারগুলি তিনি মূর্ত করেছিলেন নিজভঙ্গিমায় ... বর্ষীয়ান শিল্পী দেবব্রত চক্রবর্তীর ভাষায় , কিছুটা ফ্যান্টাসি মোড়কে।
চিত্রশিল্পের নানা মাধ্যম নিয়ে পরিক্ষানিরীক্ষা করেছিলেন, সিদ্ধহস্ত ছিলেন পেনসিল, ক্রেয়ন, চারকোল, জলরঙ, ছাপাই ছবি, কোলাজ ও তেলরঙে। প্রতিটি মাধ্যমের রচনাকৌশলও ছিল ভিন্ন। কাজ করতেন দীর্ঘসময় ধরে, কাজের সময় সম্পূর্ণ মগ্ন থাকতেন ক্যানভাসে। মধ্যে মধ্যে চা-পানের বিরতি নিতেন, সেইসময় স্টুডিওতে উপস্থিত নির্বাচিত বন্ধু ও তরুণ শিল্পীদের সাথে আড্ডা দিতেন। শিল্পী বিকাশ ভট্টাচার্যের সব কাজেই ছিল যত্ন। রঙের টিউব বা টুকরো, তুলি, ক্যানভাস, তুলি, স্প্যাচুলা, প্যালেট অত্যন্ত যত্ন করে সাজিয়ে রাখতেন। পরিপাট করে গুছিয়ে পরিষ্কার করতেন প্যালেট, বোর্ড, তুলি অথবা রঙের শিশি।
অনুজ শিল্পীদের তিনি বলতেন, 'যে জিনিস নিয়ে কাজ করবে, তার যত্ন না করলে কাজ ঠিকমতো হবেনা। পুরোপুরি ভালোবাসা চাই। একজন শিল্পী তো ছবি আঁকাতেই তাঁর দায়িত্ব শেষ করে না। তাঁর সব কিছুর মধ্যে যেন শিল্প থাকে এবং তা থাকবে একেবারে স্বাভাবিকভাবেই।
শিল্পী বিকাশ ভট্টাচার্য ১৯৪০ সালে কলিকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। অল্পবয়সে তিনি পিতৃহারা হন, আর সেই অভিজ্ঞতা থেকে জন্ম নেওয়া গভীর নিরাপত্তাহীনতা এবং সুবিধাবঞ্চিতদের প্রতি তাঁর সুহানুভুতি আজীবন শিল্পীর শিল্পশৈলীকে প্রভাবিত করেছিল। ইন্ডিয়ান কলেজ অফ আর্ট এন্ড ড্রাফসম্যানশিপ থেকে তিনি ১৯৬৩ সালে ফাইন আর্টের উপর ডিপ্লোমা করেন এবং কিছুকাল সেই কলেজেই অধ্যাপনা করে পরবর্তীতে গভর্মেন্ট কলেজ অফ আর্ট এন্ড ক্রাফট এ অধ্যাপক হিসাবে যোগদান করেন। এরপর ১৯৮২ সালে শিল্পে পূর্ণমাত্রায় নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি কলেজের চাকুরী ছেড়ে দেন। কলিকাতা, বোম্বাই, দিল্লী সহ ভারতের বিভিন্ন শহরে তাঁর একক ও যৌথ প্রদর্শনী দর্শক ও শিল্পসংগ্রাহকদের প্রশংসা কুড়িয়েছে।
দেশের বাহিরে প্যারিস, যুগোশ্লোভিয়া, চেক প্রজাতন্ত্র, রোমানিয়া, হাঙ্গেরী এবং লন্ডন ও নিউইয়ার্কে শিল্পীর প্রদর্শিত ছবি বাঙালির নাম উজ্জ্বল করেছে বললে বিন্দুমাত্র ভুল হবে না। ভারত সরকারের 'পদ্মশী', ললিতকলা ফেলোশিপ সহ অসংখ্য পুরষ্কারে ভূষিত হন শিল্পী।
অত্যাধিক পরিশ্রমের কারণে ২০০০ সালে সেরিব্রাল স্টোকে তিনি পঙ্গু হয়ে পড়েন এবং ১৮ ডিসেম্বর, ২০০৬ সালে আমাদের কাছ থেকে চিরদিনের মত বিদায় নেয়। তাঁর তুলি থেমে গিয়েছিল কিন্তু শিল্পকলায় তাঁর অবদান আজও অনুজ ও শিল্পপ্রেমীদের সমৃদ্ধ করে চলেছে।







ভালো লাগলো, তথ্ সমৃদ্ধ লেখা।
ReplyDeleteভালো লাগলো লেখা
ReplyDelete