![]() |
| Artist Safiuddin Ahmed |
একটি ছোটোমাপের লিথোগ্রাফ চিত্রপট, মাত্র ২০/৭.৭ সেন্টিমিটার। কলিকাতার রাস্তার ফুটপাথে একটি ল্যাম্পপোষ্টের পাশে একজন জুতোপালিশওয়ালা নীরবে একজনে ইউরোপীয় পোশাক পরিহিত ব্যক্তির জুতো পালিশ করছেন ... এতটুকু মাত্র বিষয়। কিন্তু এতো সাদামাটা রচনার কি প্রয়োজন সেই শিল্পীর, যিনি ভবিষ্যতে বাংলাদেশের 'আধুনিক ছাপচিত্রের জনক' হিসাবে পরিচিত লাভ করবেন।
![]() |
| lithography by Safiuddin Ahmed |
আসুন একটু খুঁটিয়ে দেখি। চিত্রপত্রটির একপাশে হাঁটু মুড়ে বসা নগ্নপদ এই শ্রমজীবী মানুষটি লুঙ্গী ও হাতকাটা গেঞ্জি পরিহিত।তাঁর একপাশে পালিশের সামগ্রী বর্তমান। সামান্য আলো তাঁর পিঠ ছুঁয়ে গেছে, বাকি সর্বাংশ আঁধারিতে মেশানো ... মাথা নিচু করে একমনে জুতো পালিশ করছেন। দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তির বুকের নিচ থেকে জুতো পর্যন্ত দৃশ্যমান ... ছবির জেষ্টারে সামান্য দাম্ভিকতা বর্তমান। ডান হাতটির দৃশ্যত অংশটি দর্শক মনে অস্বস্তির কারণ বলে মনে হবে। পুরো ছবিটা চমৎকার আলোছায়ায় ভারসাম্যে বন্টিত। কোথাও কোথাও আলোছায়ার কনট্রাস্ট-এ নরম রঙের মীড় অনুভব করা যায়, যেটি শিল্পী সফিউদ্দিন আহমেদের চিত্ররচনার বৈশিষ্ট্য বলে আমার মনে হয়। একটু লক্ষ্য করলে দেখব চিত্রপটের পশ্চাদপটে দেওয়ালে একটি সাঁটা পোষ্টার, যার নিচের একটি অংশ মুড়ে আছে বলে লিখিত বাক্যটি সম্পূর্ণ পড়া যাচ্ছে না। এখানেও শিল্পী উপস্থাপিত করেছেন একজোড়া নগ্নপদ ও ... MORE FOOD কথাটি। এখান থেকে একজন দর্শক ভাবতে শুরু করেন।
রচনাকালে কোনো শিল্পীই অপ্রয়োজনীয় কিছু দিয়ে চিত্রপট সাজান না ... তাঁর সাজানোটি হয় নিক্তি মেপে। কারণহেতু দৃশ্যত টুকরো অংশগুলি বিশ্লেষণ করেই একজন রসিক দর্শক বুঝতে পারেন শিল্পীমনের সৃজনশীলতা ও উপলব্ধি। আর দায়িত্ববান শিল্পীও উলটোপালটা চিহ্ন বা সংকেত সরবরাহ থেকে বিরত থাকেন, যাতে করে দর্শকের মনে সেই ছবি সম্পর্কিত ভুল বার্তা না পৌঁছায়। আরো একটু খেয়াল করলে দেখতে পাবেন জুতোপালিশওয়ালার ছায়ারূপী অস্তিত্ব যেন ঐ প্যান্টালুন পরিহিত লোকটির বুটের তলায় চাপা পড়েছে। চিত্ররচনার সময়কালটি খেয়াল করুন, ১৯৪৪ সাল সদ্য ভারতবর্ষ তেতাল্লিশের দুর্ভিক্ষ কাটিয়ে উঠেছে, একমুঠো খাবারের জন্য চলছে হাহাকার, অন্তত দেওয়ালে সাঁটা পোষ্টার সেই কথাই বলে, কারণ নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন ইংরাজি ভাষায় লেখা পোষ্টারটি এই শ্রমজীবী মানুষটির পড়ার জন্য নির্মিত হয় নি। নির্মিত হয়েছে তৎকালীন শিক্ষিত সমাজ ও ব্রিটিশ সরকারের চেতনাকে উদ্দেশ্য করে, যাদের বিবেক ও গোষ্ঠীবদ্ধ কার্যকলাপের কারণে ঘটেছিল মানুষ নির্মিত ভয়াবহ তেতাল্লিশের দুর্ভিক্ষ ..তৎকালীন সময়ে তারা সমগ্র শ্রমজীবী মানুষদের অস্তিত্ব নিজেদের পায়ের তলায় এইভাবে মাড়িয়ে রাখতে চেয়েছে বললে খুব একটা ভুল হবে না।
যেকোনো কালজয়ী শিল্পী তাঁর চিত্রপটে নিজের সময়কাল ও ব্যক্তিগত অবস্থানকে চিহ্নিত করে রাখেন। রসিকজনের কাজ চিত্রপটের সেইসব সংকেত উদ্ধার করে তার থেকে শিল্পবোধ নির্মান করা। শিল্পকলা কখনই একমুখী রচনা নয় ... এখানে শিল্পী ও রসিক দুইয়ের নির্মিত শিল্পবোধ জন্ম দেয় নতুন চেতনার। শিল্পী চেয়েছিলেন দিকে দিকে এই ছবিটি ছড়িয়ে পড়ুক, তাই জলরঙ বা তেলরঙ নয়, তিনি বেছে নিয়েছিলেন লিথোগ্রাফকে, যার মাধ্যমে ছবিটির প্রিন্ট সর্বত্র ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব।
সফিউদ্দিন আহমেদ ২৩শে জুন, ১৯২২ সালে কলিকাতার ভবানীপুরে জন্ম নেন। ১৯৩৬ সালে কলকাতা আর্ট স্কুলে ভর্তি হন এবং ১৯৪২ সালে এখান থেকে চারুকলায় স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। পরবর্তীতে তিনি যুক্তরাজ্যেের সেন্ট্রাল স্কুল অফ আর্টস অ্যান্ড ক্র্যাফটস্ থেকে এচিং ও এনগ্রেভিংয় বিষয়ে ডিপ্লোমা ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর কলকাতা থেকে ঢাকায় ধানমন্ডিতে চলে আসেন।
শিল্পী সফিউদ্দিন আহমেদ বলতেই চোখ বন্ধ করলেই ভেসে আসে নরম রঙের মীড় ... নিসর্গ থেকে স্থিরচিত্র, প্রতিকৃতি থেকে নগরজীবন দর্শন অথবা ভাষা আন্দোলন থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ ... সর্বত্রই এনার তুলি চলেছে সমান গতিতে। দেখিয়েছেন রেখাকে কতটা সরল, কতটা মার্জিত করে চিত্রপটে ব্যবহার করা যায় ... যা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে শিক্ষনীয় বিষয়ও বটে। জলরঙ ও তেলরঙ উভয় মাধ্যমেই তিনি দক্ষ ছিলেন। ছাপচিত্র জগতে ওনার অবদান অনস্বীকার্য ... বাংলাদেশের আধুনিক ছাপচিত্রের জনকও বলা ওনাকে। রেখার মার্জিত ব্যবহার এবং জীবনযুদ্ধে 'অতি অল্পে সন্তুষ্ট' শিল্পী ছিলেন সফিউদ্দিন আহমেদ, অর্থাৎ শিল্পবোধ এবং জীবনদর্শনের মধ্যে সমতা রেখেছিলেন আজীবন। ফলে সৃষ্টি হয়েছিল একের পর এক অমূল্য সব রত্নরাজী। মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন আত্মিক উন্নতি আর শৈল্পিক উন্নতি। সহজাত বিনয়ী ছিলেন, এরসাথে যুক্ত হয়েছিল সাহিত্য পিপাসা ও সংগীতানুরাগ। ছাপচিত্র নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষার অভিজ্ঞতা শিল্পীকে বানিয়েছিল বিজ্ঞানমনস্ক ও সৃষ্টিশীল মুক্তদৃষ্টি। বারংবার বললেন 'আমার সবচেয়ে ভালো ছবিটি আমি এখনো আঁকতে পারি নি।' এই গভীর অতৃপ্তিবোধ একজন শিল্পীকে নিয়ে যায় মহানতার পথে। তাই আপামর শিল্পরসিক বাংলাদেশের নাগরিকগণ 'শিল্পগুরু সফিউদ্দিন আহমেদ' বলে ওনাকে সন্মান জানিয়েছেন।
দেশ বিদেশের অসংখ্য পুরষ্কার ও পদকে ভূষিত হয়েছেন শিল্পী। বাংলাদেশ সরকার তাঁকে 'একুশে পদক' এবং 'স্বাধীনতা দিবস পুরষ্কার' দিয়ে সন্মান জানায়। বার্ধক্যজনিত কারণে ১৯ মে ২০১২ শনিবার রাত ১২টা ২০ মিনিটে ঢাকা স্কয়ার হাসপাতালে বিদায় নেন আমাদের কাছ থেকে।





