বিশ্বভারতীর কলাভবনের ডিজাইন বিভাগের বাড়ির দেওয়ালে নতুন করে সাদা-কালো ম্যুরাল আঁকছেন মানি দা, সময়কাল ২০০৯-২০১০ । সেইসময় এক অনুজ শিল্পী ওনাকে প্রশ্ন করেন
'মানিদা, এই যে এত কষ্ট করে আঁকছেন বাহিরের দেওয়ালে বছর ১০ পর তো সব উঠে যাবে প্রাকৃতিক কারণে ...'
'তখন এসে আবার আঁকব' ... শিল্পীর সরল উক্তি।
না, মানিদা আর ফিরে আসতে পারবেন না তা আমরা সবাই জানি ... কিন্তু এই উক্তির মধ্যে তাঁর যে শিল্পচর্চার প্রতি আত্মবিশ্বাস তা কখনই ভোলা যাবে না।
ভালো থাকুন মানিদা ...
---------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
কে. জি. সুব্রামনিয়ন ১৫ই ফেব্রুয়ারি ১৯২৮ সালে উত্তর কুথুপারম্বা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। জীবনের শুরুতে অর্থাৎ সদ্য তরুণাবস্থায় ভারত ছাড়ো আন্দোলনে যোগ দিয়ে কারাবরণ করেন। এই ঘটনার ফল স্বরূপ ইংরেজ আমলের সব ধরণের সরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যোগ দেওয়ার অধিকার বিনষ্ট হয় এবং একপ্রকার বাধ্য হয়েই ১৯৪৪ সালে শান্তিনিকেতনের কলাভবনে ভর্তি হন। এই পর্যন্ত পড়েই যে কোনো পাঠকই ভবিষ্যত বাণী করবেন '... এই ছেলের কিচ্ছু হবে না'। কিন্তু কিভাবে তিনি হয়ে উঠলেন সবার প্রিয় 'মানিদা' ... সেইটাই হল তাঁর শিল্পজীবন নির্মাণ। কলাভবনে শিক্ষক হিসাবে পেয়েছিলেন নন্দলাল বসু, রামকিংকর বেইজ এবং বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়কে।
তারপর উচ্চতর শিক্ষার জন্য ১৯৫৫-৫৬ সালে লন্ডনের 'স্লেড স্কুল অফ আর্ট' এ পাঠ নেন, পরিচয় ঘটে পাশ্চাত্যের শিল্পকলার আন্তর্জাতিকতার সাথে। দেশে ফিরে তিনি কিছুদিন বরোদায় ফ্যাকাল্টি অব আর্টে অধাপনা করেন ও কিছুদিন কলাভবনে। ১৯৭৯ এর পর তিনি সন্মানিত হলেন কলাভবনের এমরিটাস প্রফেসর হিসাবে। সেইকারণে কলাভবন ও বরোদা দুটোই তাঁর বসতবাড়ি হিসাবে শিল্পমহলে পরিচিতি লাভ করে।
শৈশবে গ্রামীণ জীবনে কেরলের মন্দির দেওয়ালচিত্র, কাঠের কারুকার্য, ভাস্কর্য ও গ্রামীণ নানা উৎসবের মাধ্যমে তাঁর চিন্তায় যে স্বদেশী চেতনার বীজ অঙ্কুরিত হয়েছিল তা ধীরে ধীরে শান্তিনিকেতনের পরিবেশে শিল্পী বিনোদবিহারীর উত্তরাধিকারী হিসাবে প্রতিষ্ঠিত পেলো। মানিদা শিল্পকলা জগতে প্রতিষ্ঠা পান যখন তাঁর বয়স ৫৫ থেকে ৬০ বছর। তাঁর নন্দনচিন্তা ও শিল্প ভাবনায় স্বদেশী এবং আন্তর্জাতিক শিল্পের যে মেলবন্ধন তা রসিকমহলের সম্ভম আদায় করে নিয়েছে। সেই কারণে তাঁর শিল্পকলা জগতের ভূমিবন্ধন অনুসরণ যোগ্য। দীর্ঘ ৩০ অধিক বছর ধরে শিল্পকলা সম্পর্কে তাঁর মেধা লিখিত রূপে প্রকাশ পেয়েছে।
এর মধ্যে অন্যতম 'দ্য ক্রিয়েটিভ সার্কিট' এবং 'দ্য লিভিং ট্রাডিশন'। নিরলস চর্চায় টেরাকোটা, ছাপচিত্র, ভাস্কর্য, কোলাজ, ম্যুরাল এবং চিত্রকলা সব জগতেই তিনি অবাধে বিচরণ করতে পেরেছিলেন। কলাভবন প্রাঙ্গণে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে মানিদার সৃষ্ট ভাস্কর্য, শিল্পাচার্য নন্দলালের স্টুডিয়োর বাহিরের দেওয়ালচিত্র, এবং দুটি পর্যায়ে করা কলাভবনের ডিজাইন বিভাগের বাড়ির চারদিকের দেওয়ালচিত্র উল্লেখযোগ্য। ছোটদের জন্য লিখেছেন চিত্রিত কবিতা। নিজ শিল্পচর্চায় বিষয় উপস্থাপনায় শিল্পী কখনো পুরাণকল্প থেকে নির্বাচন করতেন, কখনো বা সমসাময়িক রূপকল্প, আবার কখনো পশুপাখি অথবা কখনো এই তিনের মিশ্রণ অনায়াসে অত্যন্ত দক্ষতায় চিত্রপটে মেলে ধরতেন।
অসংখ্য পুরষ্কারে ভূষিত হন শিল্পী কে. জি. সুব্রামনিয়ন, এর মধ্যে অন্যতম কালিদাস সন্মান, পদ্মভূষণ, পদ্মবিভূষণ (২০১২)। ভারতের অত্যন্ত শক্তিশালী আধুনিক শিল্পকলার পথিকৃৎ বরোদায় বিরানব্বই বছর বয়সে চিরশান্তিধামে পাড়ি দেন ২৯মে জুন, ২০১৬। রেখে গেলেন একমাত্র কন্যা, অসংখ্য শিল্প উত্তরাধিকারী এবং গুণমুগ্ধ দর্শক।
ছবি সৌজন্য : Google , Seagull Art






