শ্রীমান কুণাল,
তুমি আমার কাছ হতে
ভাস্কর্য বিষয়ে কিছু লেখতে এবং
জানতে চেয়েচ।
ভাস্কর্য সম্বন্ধে বলার কিছু নাই,
খালি করার কথা।
ভালো মাটি জোগাড় করতে হবে
আর জল সে ত তোমার কাছেই রয়েচে,
তোমার যা ইচ্ছা করে যেও,
কারোর উপদেশের অপেক্ষা না করে।
প্রকৃতির মধ্যে যথেষ্ট রূপের সন্ধান রয়েচে
সেটিই শিক্ষার আবেষ্টনি, তার
থেকেই আহরণ এবং
শিক্ষা নিয়েই কারবার হবে।
প্রথমে মাটিতে করার পর শক্ত রকমের
আধার (মিডিয়াম) নিয়ে
কাজ করা যায়। যেমন কাঠ, পাথর
ধাতু ইত্যাদি।
করে যাওয়াটাই কৃতিত্ব, তার জন্য
চাই আদম্য শক্তি এবং আনন্দ।
শান্তিনিকেতন
১১/৪/৭৩
ছাত্র কুণাল সাহাকে ভাস্কর্য নিয়ে যে কয়টি পংক্তি লিখেছিলেন তা থেকে শিল্পী রামকিংকর বেজ এর দর্শনের আভাস মেলে। ভাস্কর্য অথবা ছবি রচনায় তিনি যেমন খোলামেলা ছিলেন, লেখা ও কথাতেও তাই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবি আঁকা সম্পর্কে এক জায়গায় বলেছিলেন 'তাই হঠাৎ যখন বুড়ো বয়সে ছবি আঁকতে শুরু করলেন তখন আমরা আড়ালে হাসাহাসি করতাম। এটাকে তাঁর একটা হাল্কা খেলা বা পাগলামী বলে মনে হতো প্রথম। পরে অবশ্য বুঝেছি যে কবিতা, প্রবন্ধ বা অন্য কোনো লিখিত শিল্প মাধ্যমে ওঁর অনেক কিছু প্রকাশ বাকী থেকে যাচ্ছে। এবং সে জন্যেই এতো এতো তাড়ায় ছবি আঁকছেন। আমি অনেক সময় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ওঁর ছবি আঁকা দেখতুম।' আজকের দিনের এই জটিল অবস্থায় এইসব উক্তি শুনে আমরা শুধুমাত্র সমৃদ্ধ নয়, বিস্মিতও হই।
মাঝে কিছুদিন এদিক ওদিক কাটালেও রামকিংকর ছাত্রাবস্থা থেকে সারাজীবনই শান্তিনিকেতনে কাটিয়ে ছিলেন। ছবি ও ভাস্কর্য দুটিতেই সমান পারদর্শী তিনি ... বলতেন, যখন নৈসর্গিক পরিস্থিতির মধ্যে কিছু দেখি, তখন পেন্টিং হয়ে যায়। তখন রঙ আসে। ফ্ল্যাট ক্যানভাস আসে। আর মূর্তির বেলায় সেটাই আরো 'সংহত' হয়ে একটি রঙবিহীন মাধ্যমে এসে পৌঁছোচ্ছে। যেমন অন্ধকারে একটা বাচ্চার গায়ে হাত বুলোই। চারদিক থেকে তাকে অনুভব করেছি।
বলতেন, আর্ট একধরণের চ্যালেঞ্জ। বিশাল ঝুঁকি। জীবনের কুৎসিত নগ্নতা, সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে সৃজনশীল প্রানবন্ততার চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ এবং তার প্রতিক্রিয়া একজাতের খেলা। শিল্পের খেলা। হারজিতটা বড়ো কথা নয়। আজকের হার আগামীকালের জয় বলেও চিহ্নিত হতে পারে। অথবা বিপরীতও সত্য। খেলাটাই আসল। এই খেলা যে পূর্ণ আস্থা নিয়ে খেলতে পারবে সেই শিল্পী।
আজ সেই মহান চিত্রশিল্পী ও ভাস্কর রামকিংকরের একচল্লিশতম মৃত্যুবার্ষিকী ... প্রণাম তাঁকে।


