"প্রকৃতি থেকে নিজস্ব রুচি অনুযায়ী ছবির বিষয়বস্তু আহরণ করতে না শিখলে শিল্পীর ছবির দারিদ্র্য ঘুচবে না ও শিল্পীসুলভ মেজাজও তৈরী হবে না এবং স্বাধীনচেতা শিল্পী-চরিত্র গড়ে উঠবে না।"
- শিল্পী গোবর্ধন আশ
১৯০৭ সালে ৫ই আগষ্ট পশ্চিমবঙ্গে হুগলী জেলার বেগমপুরের প্রখ্যাত আশ পরিবারে গৌরী দেবীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন শিল্পী গোবর্ধন আশ মহাশয়। মাত্র নয় বছর বয়স যখন, তখন শিল্পীর পিতা হরিচরণ আশ এই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। ছোটোবেলা থেকে শিল্পীর শিল্পকলার প্রতি ঝোঁক লক্ষ্য করে নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও গোবর্ধন আশ গর্ভমেন্ট আর্ট স্কুলে ভর্তি হলে, তাঁর পরিবার বরাবর সহযোগিতা করেছিল। শিল্পশিক্ষায় গুরু হিসাবে পেয়েছিলেন শ্রদ্ধেয় শিল্পী অতুল বসু মহাশয়কে, যার সাহচর্য্য শিল্পীকে অজেয় করেছিল। এনার কাছে শিল্পীর তেলরঙ শিক্ষা, প্রসঙ্গত জানাই সহকারী হিসাবে তৈলচিত্রে কিংবদন্তী শিল্পী অতুল বসুর সাথে কাজ করবার একমাত্র বিরল সুযোগ লাভ করেছিলেন গোবর্ধন আশ ... যা শিল্পীকে পরবর্তীকালে তেলরঙে দক্ষ প্রতিকৃতি শিল্পী হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য করেছিল। কালক্রমে তাঁর দক্ষতা এইরকম পর্যায়ে পৌঁছায় যে পৃথিবী বিখ্যাত শিল্পী টারনার, ভ্যান উইলিয়াম অরপেন, জেসাস রেনোল্ড, উইলিয়াম ড্যানিয়েল
প্রমুখ শিল্পীর অঙ্কিত ছবির রেস্টোরেশন-রেনোভেশনের কাজে শিল্পীকে নিয়োজিত করা হয়েছিল। এইসব মাষ্টার পেন্টারদের আঁকার বিভিন্ন ধারা ও পদ্ধতি অধ্যয়নের সম্যক জ্ঞান শিল্পীকে সমৃদ্ধ করেছিল এবং তাঁর চিত্ররচনায় তিনি উত্তমরূপে তা প্রয়োগও করেছিলেন। মাদ্রাজে শিল্পী ভাস্কর দেবীপ্রসাদ রায়চৌধুরীর কাছে শিল্পশিক্ষা শিল্পীর দর্শনকে উত্তরণ ঘটাতে সাহায্য করেছিল। পরবর্তীকালে বিখ্যাত শিল্পী যামিনী রায়ের সাহচর্য্য লাভ করেন তিনি, এবং তাঁর কাছেই দেশী রঙের প্রয়োগ শিখেছিলেন। শিল্পী জীবনে গোবর্ধন আশ যখনই সময় পেয়েছেন ছুটে গেছেন প্রকৃতির কাছে ... অসংখ্য স্কেচ, জলরং -এ ছড়িয়ে আছে তার নিদর্শন। আর্ট স্কুলে পড়ার সময় ওখানের ছাত্রদের অঙ্কন সামগ্রী সরবরাহ করে তার লভ্যাংশ থেকে নিজের রংতুলির চাহিদা মিটিয়েছেন। পরবর্তীকালে সরাসরি অথবা ফটোগ্রাফ থেকে প্রতিকৃতি অঙ্কন এবং ছবি বিক্রি করে নিজের ও পরিবার প্রতিপালন করেছেন যা এখনো তরুণ শিল্পীদের 'চলার উপায়' হিসাবে পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করে
চলেছে। ১৯৪২ এর দূর্ভিক্ষের সময় তাঁর চিত্রিত শিল্পকর্ম এখনো সেইসময়কার দলিল হিসাবে বিবেচিত হয়। পরবর্তীকালে ১৯৪৮ সালে সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত ভারতীয় চিত্রপ্রদর্শনী শিল্পী গোবর্ধন আশকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দেয়, উল্লেখ্য সেই প্রদর্শনীতে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, যামিনী রায় প্রমুখ শিল্পীদের ছবিও ছিল। এরপর তিনি প্রখ্যাত 'ক্যালকাটা গ্রুপ' এর সদস্য হিসাবে নির্বাচিত হন।
ইউরোপীয় রিয়ালিজমের হাত ধরে শিল্পী গোবর্ধন আশের ছবির জগত গড়ে উঠেছিল এবং প্রতিকৃতি শিল্পী হিসাবে তাঁর যথেষ্ট সুনাম ও অর্থ দুই হয়েছিল কিন্তু তিনি যদি সেইসময় থেমে যেতেন এবং নিজের শৈলীর রিপিটেশন করতেন তবে কালের গর্ভে হারিয়ে যেতেন সমসাময়িক অধিকাংশ এই ঘরানার শিল্পীদের মতন। কিন্তু সেটি না করে তিনি এই ধারাবাহিক প্রথার বিবর্তনের প্রয়োজনবোধ করেন এবং অবজেকটিভ রিয়ালিটি থেকে ধীরে ধীরে সাবজেকটিভ রিয়ালিটির দিয়ে অগ্রসর হলেন। তিনি মেতে উঠলেন বেপরোয়া রঙের খেলা নিয়ে। তিনি শিল্পের গভীরে ডুব দিয়ে রঙের অন্তর্নিহিত রহস্য আবিষ্কার করলেন, ফলে তাঁর ছবির চরিত্রে বদল এলো, বলা ভালো পরিমার্জিত হলো ... ছবি হয়ে উঠল পূর্বাপেক্ষা উজ্জ্বল, স্বতঃস্ফূর্ত এবং প্রাণবন্ত ... রঙ হয়ে উঠল জীবন্ত।
জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তাঁর শিল্পচর্চা অব্যাহত ছিল। দেশে বিদেশে অসংখ্য প্রদর্শনী, পুরস্কার, সন্মান পেয়েছেন, পেয়েছেন শিল্পরসিকদের অফুরন্ত ভালোবাসা ... শ্রদ্ধা। আজীবন জন্মস্থান বেগমপুরের নান্দনিক সমৃদ্ধির জন্য নীরবে কাজ করে গেছেন। আর তিনিই হলেন একমাত্র বিরল কিংবদন্তী শিল্পী যার পুত্র-পৌত্র-প্রপৌত্র সবাই বংশ পরম্পরায় চার প্রজন্ম আক্ষরিক অর্থেই শিল্পী।









